লাভ ঠিকাদারের খরচ সরকারের , মাতারবাড়ী সড়ক প্রকল্পে বালু বাণিজ্য

0

অল ক্রাইমস.টিভি ডেস্ক

মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকে ঘিরে নির্মাণাধীন সংযোগ সড়ক প্রকল্প এখন শুধু অবকাঠামো উন্নয়নের গল্প নয়—এটি পরিণত হয়েছে বিতর্ক, অভিযোগ এবং সম্ভাব্য বড় ধরনের আর্থিক অনিয়মের এক আলোচিত ঘটনায়। প্রায় ১২ হাজার ৯৪২ কোটি টাকা ব্যয়ে ২৭.২ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণের এই প্রকল্পে প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় ধরা হয়েছে বিস্ময়কর ৪৭৬ কোটি টাকা, যা শুরু থেকেই প্রশ্ন তুলেছে নানা মহলে।

তবে সবচেয়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছে সড়ক নির্মাণে ব্যবহৃত বালু উত্তোলনকে ঘিরে। অভিযোগ উঠেছে, পরিকল্পিতভাবে এমন একটি ব্যবস্থা করা হয়েছে যেখানে লাভের বড় অংশ যাবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পকেটে, আর খরচ বহন করবে সরকার। অর্থাৎ জনগণের টাকায় খরচ, কিন্তু মুনাফা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের—এমন এক অস্বাভাবিক সমীকরণই সামনে এসেছে অনুসন্ধানে।

জানা গেছে, ‘টোকিও-এমআইএল-জেভি’ নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কোনো উন্মুক্ত দরপত্র ছাড়াই সাগর থেকে বালু উত্তোলনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এখানেই শেষ নয়—পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়াই এই অনুমোদন দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট দপ্তর জানিয়েছে। বালুর মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে প্রতি ঘনফুট ৬ টাকা ৯৪ পয়সা, অথচ সেই বালু উত্তোলনের জন্য ড্রেজিং খরচ বাবদ প্রতি ঘনফুটে ৪ টাকা ৫৬ পয়সা সরকারই বহন করবে। ফলে বাস্তবে ঠিকাদার কম খরচে বালু পেয়ে সেটি থেকে মুনাফা করবে, আর সরকারের রাজস্ব আয় নেমে আসবে খুবই সামান্য পর্যায়ে।

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এই প্রকল্পসহ সংশ্লিষ্ট উন্নয়ন কাজে প্রায় ১০০ থেকে ১৪০ কোটি ঘনফুট বালুর প্রয়োজন। যদি নির্ধারিত বাজারমূল্যে এই বালু বিক্রি করা হতো, তাহলে সরকারের অন্তত ৬৯৪ কোটি টাকার রাজস্ব পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বর্তমান ব্যবস্থায় সেই সম্ভাবনা কমে গিয়ে বড় অংশের অর্থ ঠিকাদারের লাভে রূপ নিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো—কিছু প্রতিষ্ঠান সরকারের কোনো অর্থ ছাড়াই বেশি রাজস্ব দেওয়ার প্রস্তাব দিলেও তা আমলে নেওয়া হয়নি। বরং কম মূল্যে এবং সরকারি খরচে বালু উত্তোলনের সুযোগ দেওয়া হয়েছে নির্দিষ্ট একটি প্রতিষ্ঠানকে। এতে প্রতিযোগিতা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা—তিনটিই প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।

পরিবেশের দিক থেকেও বিষয়টি উদ্বেগজনক। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন ছাড়াই এ ধরনের বালু উত্তোলন আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু বাস্তবে সেই নিয়ম উপেক্ষা করা হয়েছে বলেই অভিযোগ।

ঘটনাটির আরেকটি চাঞ্চল্যকর দিক হলো, প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গোপন সমঝোতার অভিযোগ উঠেছে। দাবি করা হচ্ছে, প্রকৃত প্রয়োজনের তুলনায় কম পরিমাণ বালুর অনুমোদন নিয়ে পরে বড় আকারে সরবরাহ দেখিয়ে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এতে সরকারের শত শত কোটি টাকা ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

প্রশাসনিক পর্যায়েও নানা নাটকীয়তা দেখা গেছে। অনুমোদন না দেওয়ায় দায়িত্বপ্রাপ্ত এক কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। এরপর নতুন প্রশাসনিক ব্যবস্থায় দ্রুত অনুমোদন পাওয়া গেছে, যা পুরো প্রক্রিয়াকে আরও সন্দেহজনক করে তুলেছে।

এ পরিস্থিতিতে দুর্নীতি বিরোধী সংগঠনগুলো বিষয়টিকে ক্ষমতার অপব্যবহার এবং জনগণের সম্পদের সম্ভাব্য লুটপাট হিসেবে দেখছে। তাদের মতে, রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও প্রতিযোগিতা নিশ্চিত না হলে উন্নয়ন প্রকল্পগুলোই হয়ে উঠতে পারে দুর্নীতির সবচেয়ে বড় ক্ষেত্র।

সব মিলিয়ে মাতারবাড়ী সংযোগ সড়ক এখন শুধু একটি অবকাঠামো প্রকল্প নয়—এটি হয়ে উঠেছে একটি বড় প্রশ্নের নাম: উন্নয়নের আড়ালে কার স্বার্থ রক্ষা হচ্ছে?

নিউজটি সম্পর্কে আপনার মতামত দিন