যশোরে সরকারি ভর্তুকিতে কেনা ৮১ কম্বাইন হারভেস্টারের অর্ধেকের হদিস নেই

0

অল ক্রাইমস.টিভি ডেস্ক

যশোরে সরকারি ভর্তুকিতে কেনা ৮১টি কম্বাইন হারভেস্টারের মধ্যে ৪০টিরই হদিস নেই স্থানীয় কৃষি মাঠে, ফলে বোরো মৌসুমে প্রতিকূল আবহাওয়ায় ধান কাটা নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন জেলার কৃষকরা।

যশোরের দিগন্তজোড়া মাঠে এখন পুরোদমে বোরো ধান কাটার উৎসব চলার কথা থাকলেও বৃষ্টির কারণে কৃষকের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে। পাকা ধান পানিতে ভাসছে, আর এই জরুরি সময়ে ফসল দ্রুত ঘরে তোলার জন্য আধুনিক কৃষিযন্ত্রের অভাব তীব্রভাবে অনুভূত হচ্ছে। সরকারি নথি অনুযায়ী জেলায় ৮১টি কম্বাইন হারভেস্টার থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে মাঠে কাজ করছে মাত্র ৪১টি। বাকি ৪০টি মেশিনের কোনোটি অকেজো হয়ে পড়ে আছে, আবার কোনোটি নিয়মনীতি উপেক্ষা করে অন্য জেলায় ভাড়ায় খাটানো হচ্ছে।

কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছর থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত ‘সমন্বিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ’ প্রকল্পের আওতায় যশোরের আটটি উপজেলায় এই ৮১টি কম্বাইন হারভেস্টার সরবরাহ করা হয়েছিল। প্রতিটি মেশিনের বাজারমূল্য প্রায় ৪০ লাখ টাকা, যেখানে সরকার ১৫ লাখ টাকা ভর্তুকি দিয়েছে এবং অবশিষ্ট ২৫ লাখ টাকা কৃষক নিজে বহন করেছেন। বর্তমানে সচল থাকা ৪১টি মেশিন দিয়ে গত ১০ মে পর্যন্ত প্রায় আড়াই হাজার হেক্টর জমির ধান কাটা সম্ভব হয়েছে। প্রতিটি মেশিন ঘণ্টায় প্রায় এক একর জমির ধান কাটতে সক্ষম হলেও অর্ধেকের বেশি যন্ত্র জেলায় না থাকায় যান্ত্রিকীকরণের সুফল পৌঁছাচ্ছে না সাধারণ কৃষকের দোরগোড়ায়।

উপজেলাভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, যশোর সদরে ১২টির মধ্যে ৫টি, চৌগাছায় ১৬টির মধ্যে ১০টি, বাঘারপাড়ায় ১৩টির মধ্যে ৯টি, শার্শায় ১১টির মধ্যে ৯টি, মণিরামপুরে ৮টির মধ্যে ২টি এবং ঝিকরগাছায় ১৬টির মধ্যে মাত্র ৬টি মেশিন সচল আছে। সবচেয়ে হতাশাজনক চিত্র অভয়নগর ও কেশবপুরে; অভয়নগরের ৪টি ও কেশবপুরের ১টি মেশিনের একটিও বর্তমানে স্থানীয় কৃষকদের কাজে লাগছে না। অভয়নগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা লাভলী খাতুন স্বীকার করেছেন যে, তাদের এলাকার মেশিনগুলো এখন অন্য অঞ্চলে ব্যবহৃত হচ্ছে।

স্থানীয় কৃষকদের মতে, এই যান্ত্রিকীকরণ প্রকল্প যশোর অঞ্চলে আশানুরূপ কার্যকর হয়নি। বাঘারপাড়ার কৃষক ফিরোজ হাসান ও ঝিকরগাছার সাইফুল ইসলাম জানান, এই অঞ্চলের জমিগুলো ছোট হওয়ায় বড় মেশিন চালানো কঠিন। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো বিচালি বা খড়। গ্রামীণ অর্থনীতিতে গবাদিপশুর খাদ্য হিসেবে বিচালির গুরুত্ব অনেক, কিন্তু বর্তমানে ব্যবহৃত বেশিরভাগ হারভেস্টারে বিচালি নষ্ট হয়ে যায়। এছাড়া যন্ত্রের মালিক হারুণ অর রশিদের দাবি, এই মেশিনগুলো স্থানীয় মাটির উপযোগী নয় এবং বারবার নষ্ট হওয়ার কারণে তারা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। লোকসান পুষিয়ে নিতেই অনেকে মেশিন নিয়ে হাওরাঞ্চলে চলে যাচ্ছেন।

যশোর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কৃষি প্রকৌশলী সুজাউল হক জানান, এই মেশিন কেনা বা সরবরাহের প্রক্রিয়ায় মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের কোনো ভূমিকা ছিল না; কোম্পানিগুলো সরাসরি কৃষকদের কাছে এগুলো পৌঁছে দিয়েছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, কম্বাইন হারভেস্টার মূলত দুই ধরনের হয়—ফুল ফিড ও হেড ফিড। হেড ফিড মেশিনে বিচালি নষ্ট হয় না, যা যশোর অঞ্চলের জন্য বেশি উপযোগী ছিল। কিন্তু ভুল পরিকল্পনার কারণে কৃষকরা এখন এই প্রযুক্তির প্রতি আগ্রহ হারাচ্ছেন। চলতি মৌসুমে জেলায় ১ লাখ ৫৭ হাজার ৯৫০ হেক্টর জমিতে বোরো চাষ হলেও যন্ত্রের অভাবে ধান ঘরে তোলা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

নিউজটি সম্পর্কে আপনার মতামত দিন