যোগদানের কয়েক ঘণ্টা পরে আবারো প্রত্যাহার সেই বিতর্কিত ওসি লিটন মিয়া

অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও প্রাইজ পোস্টিং, ক্ষতিগ্রস্তরা বলছেন ‘এটা অন্যায়’

0

হাবিবুল্লাহ মিজান

দায়িত্ব নেয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আবারো প্রত্যাহার হলেন কিশোরগঞ্জ রেলওয়ে থানার বিতর্কিত সাবেক ওসি লিটন মিয়া।
গতকাল রবিবার ঢাকা রেলওয়ে পুলিশ সুপার আনোয়ার হোসেন এক অফিস আদেশে লিটন মিয়াকে ঢাকা জেলার রেলওয়ে পুলিশের ওসি হিসেবে বদলি করেছিলেন।

অভিযুক্ত পুলিশ অফিসারকে প্রাইজ পোস্টিং দেয়ার বিষয়ে জানতে পেরে অল ক্রাইমস.টিভির পক্ষ থেকে ঢাকা রেলওয়ে পুলিশ সুপার আনোয়ার হোসেনের সাথে যোগাযোগ করা হয় আজ দুপুরে। তার ব্যক্তিগত হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বারে অল ক্রাইমস.টিভিতে ওসি লিটনের বিরুদ্ধে অভিযোগ নিয়ে প্রকাশিত পুর্বের নিউজের লিংক এবং তার প্রাইজ পোস্টিং নিয়ে ফেসবুকের একাধিক স্ক্রিনশট দেয়া হয়।

এই প্রতিবেদককে ফিরতি ফোন দিয়ে ঢাকা রেলওয়ে পুলিশ সুপার আনোয়ার হোসেন বলেন, তদন্ত কমিটি একাধিক অভিযোগ নিয়ে তদন্ত করেছিল। তবে একটা অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। ভুক্তভোগীর কাছে থেকে ৫ হাজার টাকা ঘুষ নেয়ার অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, এই বিষয়টি অকাট্যভাবে প্রমাণিত হয়নি। ভুক্তভোগী ঘুষ দেয়ার অভিযোগ করেছিলেন, কিন্তু নিরপেক্ষ কেউ এই দাবির সত্যতা প্রমাণ করতে পারেনি।

রেলওয়ে পুলিশের স্থান থেকে গাছ কাটার অভিযোগ শুনে, ওসি লিটন একজন এসআইকে পাঠিয়েছিলেন, কিন্তু তিনি নিজে যাননি। তার উচিৎ ছিল জেলা পুলিশকে জানানো। ওসি লিটনের গ্রামের বাড়িতে একাধিক মানুষের কাছে থেকে জমি কেনার নামে টাকা আত্মসাৎ করার অভিযোগ ও পাওনা টাকা চাওয়ায় তাদের মিথ্যা মামলায় হয়রানির বিষয়ে এসপি আনোয়ার বলেন, তারা কেউ আমার কাছে লিখিত অভিযোগ করেননি। আমি একজন সাংবাদিকের কাছে থেকে শুনেছি। তাদেরকে বলুন আমার কাছে লিখিত অভিযোগ করতে।

লিটনকে প্রাইজ পোস্টিং দেয়ার বিষয়ে তিনি বলেন সিনিয়র অফিসারদের সাথে কথা বলে দ্রুতই ওসি লিটনের বদলির আদেশ বাতিল করা হচ্ছে।
রেলওয়ে পুলিশের একটি সূত্র অল ক্রাইমস.টিভিকে নিশ্চিত করেছে বিতর্কিত ওসি লিটন মিয়াকে ঢাকা জেলা রেলওয়ে পুলিশের ওসি হিসেবে পোস্টিংয়ের আদেশ বাতিল করা হয়েছে ইতিমধ্যেই। তাকে আবারো ঢাকা জেলা রেলওয়ে পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করার আদেশ দেয়া হয়েছে।

এই বিষয়ে ওসি লিটন মিয়া এই প্রতিবেদককে বলেন, উর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণ যে আদেশ দিবেন, সেটাই মেনে নেবো। তিনি জানান, আজকেই তিনি ঢাকা জেলা রেলওয়ে পুলিশের ওসি গোয়েন্দা হিসেবে যোগদান করেছিলেন।

তার গ্রামের বাড়িতে স্থানীয়দের কাছ থেকে জমি কেনার কথা বলে টাকা আত্মসাতের বিষয়ে তিনি বলেন, আমি শুনেছি মানিকগঞ্জ জেলা পুলিশ এই বিষয়ে তদন্ত করছে। কিন্তু আমাকে কেউ এই বিষয়ে জানাননি। আর আমি তদন্তাধীন কোনো বিষয়ে মন্তব্য করবো না, আরো যোগ করেন লিটন মিয়া।

এর আগে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগে কিশোরগঞ্জ রেলওয়ে থানার তৎকালীন ওসি লিটন মিয়াকে প্রত্যাহার করে ঢাকা রেলওয়ে পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা হয়েছিল। এই বিষয়ে ঢাকা রেলওয়ে পুলিশ সুপার আনোয়ার হোসেন তখন দাবি করেছিলেন, তাকে আপাতত ক্লোজড করা হয়েছে ঘুষসহ বিভিন্ন অভিযোগে। একটা তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়েছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে ওসি লিটনের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

এই বছরের ২ জুলাই কিশোরগঞ্জবাসী লিটন মিয়ার বিরুদ্ধে ‘ঘুষ ও দুর্নীতির’ অভিযোগ এনে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল করেছিলেন। রেলওয়ে স্টেশন চত্বরে অনুষ্ঠিত মানববন্ধনে বক্তারা অবিলম্বে ওসি লিটনকে অপসারণ ও বিচারের দাবি জানিয়েছিলেন তারা।

মানববন্ধনে বক্তব্য দিয়েছিলেন ভুক্তভোগী কমলা বেগম, দীন ইসলাম, জেলা যুবদলের নেতা ফারুকসহ আরও অনেকে। উপস্থিত ছিলেন জেলা যুবদলের সহ-সম্পাদক ওমর ফারুক, শ্রমিকদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক দুলাল মিয়া, গুরুদয়াল কলেজ ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক রাহিম সাদ, ওয়ার্ড যুবদলের সাধারণ সম্পাদক নাজমুল প্রমুখ।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ—ওসি লিটন মিয়া রেলওয়ে থানায় কর্মরত থাকাকালে মামলা বাণিজ্য, বিচারপ্রার্থীকে হুমকি, মাদক কারবারিদের কাছ থেকে মাসোয়ারা গ্রহণসহ নানা অপরাধে লিপ্ত ছিলেন। থানায় আটকে রেখে মোটা অংকের টাকা আদায়েরও অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

২৪ জুন একটি জাতীয় পত্রিকায় “বসতবাড়ির গাছ কাটতে বাধা, ওসির বিরুদ্ধে টাকা নেওয়ার অভিযোগ” শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে বিষয়টি রেলওয়ে পুলিশের নজরে আসে। এরপর পুলিশ সুপার ১০ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছিলেন।

এলাকাবাসী অভিযোগ করেছিলেন , আঠারোবাড়ি এলাকার বাসিন্দা রতন মিয়া নিজ জমির গাছ কাটার পর তৎকালীন ওসি লিটন তার প্রতিবন্ধী স্ত্রী ও জামাইকে থানায় ডেকে এনে মামলা ও জেলের ভয় দেখিয়ে ৫ হাজার টাকা ঘুষ নেন।

অভিযোগ আছে কম দামে জমি কিনে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে তিন বছর আগে রওশন আরা বেগম নামের এক বিধবা নারীর কাছ থেকে তিন লাখ টাকা নিয়েছিলেন কিশোরগঞ্জ রেলওয়ে থানার তৎকালীন ওসি লিটন মিয়া। তবে এখনো তাকে জমি কিনে দেননি, ফেরত দেননি টাকাও। বরং ওই নারীর ছেলেকে একটি মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর অভিযোগ উঠেছে ওসির বিরুদ্ধে।

শুধু রওশন আরা বেগম নন, মানিকগঞ্জ জেলার দৌলতপুর উপজেলার আমতলী গ্রামের অন্তত ১৫ জন ভুক্তভোগীর কাছ থেকেও নানা প্রলোভনের মাধ্যমে এক কোটির বেশি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন ওসি লিটন মিয়া ও তার পরিবারের সদস্যরা বলে অভিযোগ উঠেছে।

এ বিষয়ে ভুক্তভোগীদের পক্ষ থেকে মানিকগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার বরাবর লিখিত অভিযোগ জমা দেওয়া হয়েছে। জেলা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, অভিযোগের তদন্ত চলছে। প্রমাণ মিললে পুলিশ সদর দপ্তরে শাস্তির সুপারিশসহ প্রতিবেদন পাঠানো হবে।

ভুক্তভোগী আশরাফুল ইসলাম মাসুদের দাবি, ওসি লিটন তার কাছ থেকে কয়েক দফায় মোট ৮ লাখ টাকা নিয়েছেন, কিন্তু এখন তা ফেরত দিচ্ছেন না। টাকা ফেরতের দাবিতে তারা মানববন্ধন করলে, ওসি তার ভাইয়ের মাধ্যমে ভুক্তভোগীদের বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করেছেন। এমনকি ফেসবুকে ওসির প্রত্যাহারের সংবাদ শেয়ার করায় হুমকিও দিচ্ছেন বলে অভিযোগ করেন মাসুদ।

আরেক ভুক্তভোগী আল আমিন জানান, পাওনা টাকা চাওয়ায় ওসির ভাই তার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা করেছেন।

স্থানীয়দের দাবি, ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে হাতিয়ে নেওয়া টাকায় ওসি লিটন মিয়া মানিকগঞ্জ ও ঢাকা জেলার ধামরাইয়ের বিভিন্ন এলাকায় জমি কিনেছেন। তার বাবা নিজাম উদ্দিন আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হলেও এখন পাওনাদারদের বিরুদ্ধেই রাজনৈতিক পরিচয়ের অপব্যবহার করে হয়রানি করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

ভুক্তভোগীরা দ্রুত তদন্ত শেষ করে পুলিশ কর্মকর্তা লিটনের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।

নিউজটি সম্পর্কে আপনার মতামত দিন