
এক শিক্ষক, দুই স্কুলের এমপিও—অবিশ্বাস্য কেলেঙ্কারি ফাঁস
বয়স চুরি, তথ্য গোপন—সব উপায়ে এমপিও সুবিধা হাতিয়ে নিচ্ছে শিক্ষকরা
চুক্তিভিত্তিক থেকে স্কেলে—ভুয়া নিবন্ধনেই সরকারি টাকা আত্মসাৎ
এক শাখার অনুমোদন, চালু দুই শাখা—কোটি টাকার দুর্নীতি মিরপুরের বিতর্কিত প্রতিষ্ঠানে
অবৈধ নিয়োগে এমপিও ভোগ: নথি ঘাঁটলেই মিলবে প্রমাণ!
হাবিবুল্লাহ মিজান
অল ক্রাইমস.টিভি
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের কিছু উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ঘুষ নিয়ে রাজধানীর মিরপুরের একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবৈধভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষক-শিক্ষিকাদের বাঁচানোর চেষ্টার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
অবৈধভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির অভিভাবকরা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন
মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এবং পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের কাছে আবেদন করেছেন। অল ক্রাইমস.টিভি সেই দুইটি আবেদনের কপি সংগ্রহ করতে পেরেছে।
অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, ওই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাত্র একটি শাখার অনুমোদন রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে দুটি শাখা চালু আছে। এভাবে আ ও জা আদ্যক্ষরের দুইজনকে সহকারী প্রধান শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করার অভিযোগও পাওয়া গেছে।
ডিআইএ কর্তৃক অবৈধ ঘোষিত প্রধান শিক্ষক (পরে অধ্যক্ষ), সদস্য সচিব ও ধারাবাহিক অবৈধ কমিটি কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত সহকারী প্রধান শিক্ষকদের নিয়োগ-সংক্রান্ত সকল কাগজপত্র সঠিকভাবে পর্যালোচনা করলে প্রমাণ মিলবে বলে আবেদনে দাবি করা হয়েছে।
২০০৫ সালের ২০ মার্চের পরে নিবন্ধন সার্টিফিকেট ছাড়া কোনো শিক্ষক-শিক্ষিকা নিয়োগ দেওয়া যাবে না—মর্মে রাষ্ট্রপতির প্রজ্ঞাপন উপেক্ষা করে জ, আ, জ আদ্যক্ষরের তিনজন শিক্ষক এবং জ আদ্যক্ষরের একজন শিক্ষিকাকে মাসিক তিন হাজার টাকায় চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয় বলে অভিযোগ। কিন্তু পরবর্তীতে এই চারজনকেও অবৈধভাবে স্কেলে এনে সরকারি অর্থের অংশ, পিএফ ও গ্রাচুইটি স্কুল থেকে দেওয়া হচ্ছে। তাদের অনেকে নিবন্ধন আজও করেননি বা ভুয়া নিবন্ধন দিয়ে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন বলেও আবেদনকারীরা দাবি করেছেন।
এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ম আদ্যক্ষরের ক্রীড়া শিক্ষক রাজধানীর জান্নাত একাডেমি স্কুলে কয়েক বছর চাকরি করার পর সৌদি আরব চলে যান। দীর্ঘ ছয় বছর পর এসে নিবন্ধন ছাড়াই বিতর্কিত এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ পেয়ে যোগদান করেন এবং তথ্য গোপন করে এমপিওভুক্ত হন। এমপিওর মেয়াদ দুই বছরের বেশি গ্যাপ হলেও অবৈধভাবে এই শিক্ষক সকল সুবিধা নিয়ে চাকরি করে যাচ্ছেন। পূর্বের স্কুলের শেষ এমপিও ও বর্তমান স্কুলের প্রথম এমপিও শীট যাচাই-বাছাই করলে সত্যতা মিলবে বলে জানিয়েছেন এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতি ও অনিয়ম বন্ধের দাবিতে আন্দোলনরত একাধিক শিক্ষক। ম আদ্যক্ষরের একজন শিক্ষক নিয়ম বহির্ভূত ও অবৈধভাবে একই তারিখে সিনিয়রিটি ও টাইমস্কেল একসাথে নিয়েছেন, যেখানে নিয়ম অনুযায়ী আট বছর অপেক্ষা করতে হয়। সিনিয়রিটি ও টাইমস্কেলের এমপিওর কপি তলব করলে প্রমাণ মিলবে বলে মনে করেন আন্দোলনরত শিক্ষকরা।
ম আদ্যক্ষর এবং র আদ্যক্ষরের দুইজন শিক্ষক যে পদে আবেদন ও পরীক্ষা দিয়েছিলেন, সে পদে নিয়োগ না পেয়ে নিয়োগ পান অন্য পদে। তারাও সরকারি অংশ, পিএফ, গ্রাচুইটি নিচ্ছেন প্রতিষ্ঠান থেকে, যদিও তাদের চুক্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল।
আ, ম এবং র আদ্যক্ষরের দুইজন শিক্ষক এবং একজন শিক্ষিকাকে নিবন্ধন সার্টিফিকেট ছাড়াই চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হলেও তারা স্কেল পেয়ে পিএফ ও গ্রাচুইটি সুবিধাসহ সকল সুবিধা ভোগ করে যাচ্ছেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। তাদের কেউ কেউ নিবন্ধন আজও করেননি বলে লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশেষ কমিটির শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগ দেওয়ার কোনো এখতিয়ার না থাকা সত্ত্বেও কলেজ শাখায় অনুমোদনহীন বিশেষ কমিটির মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত আ, ম এবং স আদ্যক্ষরের একজন শিক্ষক এবং দুইজন শিক্ষিকাকে নিয়োগ দিয়ে জাল কাগজপত্র তৈরি করে এমপিওভুক্ত করা হয়েছে বলেও অভিযোগ এসেছে। এতে সরকারের প্রায় পৌনে এক কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন কেউ কেউ।
এছাড়া হ আদ্যক্ষরের একজন শিক্ষিকা রাজধানীর তেজগাঁও স্কুলে চাকরিরত অবস্থায় মিরপুরের বিতর্কিত এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ পেয়ে দুটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকেই বেতন-ভাতা উত্তোলন করেছেন। ওই শিক্ষিকা তেজগাঁও স্কুল থেকে মিরপুরের কলেজে যোগদানের পরেও প্রায় চার বছর তেজগাঁও স্কুল থেকে এমপিওর টাকা উত্তোলন করেছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এই শিক্ষিকা বর্তমান মিরপুরের কলেজে অবৈধভাবে তথ্য গোপন করে এমপিওভুক্ত হন বলেও দাবি করা হয়েছে।
একইভাবে ফ আদ্যক্ষরের একজন শিক্ষিকা নরসিংদীর একটি ডিগ্রি কলেজের ইন্ডেক্সধারী প্রভাষক হয়েও মিরপুরের নন-এমপিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তথ্য গোপন করে চাকরিতে যোগদান করেন। বর্তমান প্রতিষ্ঠানে যোগদানের পরেও প্রায় এক বছর পূর্বের প্রতিষ্ঠান থেকে এমপিওর টাকা উত্তোলন করেন বলে লিখিত আবেদনে দাবি করা হয়েছে।
আ আদ্যক্ষরের একজন শিক্ষক তথ্য গোপন করে, বয়স চুরি করে নিয়োগপ্রাপ্ত হন এবং অবৈধভাবে এমপিওভুক্ত হন মিরপুরের বিতর্কিত এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে।
আবেদনে উল্লেখিত শিক্ষকদের নিয়োগ-সংক্রান্ত বিজ্ঞাপন, আবেদনপত্র, পরীক্ষার রেজাল্ট শীট, ডিজির প্রতিনিধি, নিবন্ধন ও পূর্বতন প্রতিষ্ঠানের এমপিও শীট এবং সার্টিফিকেট যাচাই-বাছাই করছে অল ক্রাইমস.টিভির ইনভেস্টিগেশন টিম।
আবেদনকারীদের মধ্যে মিরপুরের ১১ নম্বর সেকশনের মোঃ আব্দুর রহিম, পল্লবীর মোঃ জসিম উদ্দিন, মিজানুর রহমান এবং মোসলেম উদ্দিন স্বাক্ষরিত অভিযোগ অল ক্রাইমস.টিভির হাতে এসেছে।
জালিয়াতি ও অবৈধ নিয়োগের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মিরপুরের বিতর্কিত এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ। তিনি বলেছেন, প্রতিষ্ঠানে দুটি শিফট রয়েছে। সে হিসেবে দুজন সহকারী প্রধান শিক্ষক পাওয়ার কথা। তাছাড়া আমার জানামতে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়েছে তারা সকলেই বৈধ শিক্ষক।
একই পরীক্ষায় নিয়োগপ্রাপ্ত হয়ে কিছু শিক্ষক বৈধ এবং কিছু শিক্ষক অবৈধ হয় কিভাবে—সে প্রশ্নও তোলেন তিনি।





