মহৎপ্রাণ চিকিৎসকেরাই দুঃসময়ের কান্ডারি

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

অদৃশ্য শত্রু কোভিড-১৯-এর সঙ্গে যুদ্ধটা এখনো চলছে। কী প্রবল প্রতাপে এই ভাইরাস পুরো বিশ্বকে লন্ডভন্ড করে দিয়েছে। গত ৮ মার্চ প্রথম সংক্রমণ ধরা পড়ে বাংলাদেশে। ধীরে ধীরে প্রাণঘাতী এই অদৃশ্য শত্রুর দাপট বাড়তে থাকে। শুরু হয় ঘরে অন্তরীণ থাকার ভিন্ন এক জীবন। ঘরে বসে থাকলেও এই দুঃসময়ে কত কিছু দেখছি, শুনছি! কত মানুষের অমানবিক কাজের পাশাপাশি দেখছি কত মানুষকে মানবিক কাজে নিবেদিত থাকতে।

টিভিতে হাসিমুখে কেউ এসে বলছে, ‘করোনাকে দূরে সরাতে থাকব সবাই ঘরে’। কিন্তু ঘরে থাকার নামে কি সব কর্তব্যবোধ, মানবিক মূল্যবোধকে বিসর্জন দিতে হবে? আমরা অনেকেই এই মহাদুর্যোগে ঘরে থাকছি। আবার করোনাযুদ্ধে নিবেদিত সৈনিক রয়েছেন অনেকেই। বিশেষ করে চিকিৎসক, চিকিৎসাকর্মী, পুলিশ ও সেনাবাহিনী। তারাই এখন সামনের কাতারের যোদ্ধা। নিজের সুরক্ষার কথা না ভেবে আক্রান্তদের স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া, রোগীবান্ধব আচরণ করার কাজে নিবেদিত রয়েছেন চিকিৎসকবৃন্দ এবং স্বাস্থ্যকর্মীরা। এ যেন মানবতার জন্য নিজেকে উৎসর্গ করা। অনলাইনে দেখলাম ৯৮ বছরের এক ফরাসি চিকিৎসক ক্রিশ্চিয়ান শ্যান করোনা-আক্রান্তদের চিকিৎসা দিয়ে চলেছেন। কী অনন্য কর্তব্যবোধ ও মানবিকতা! বৃদ্ধ বয়সেও তিনি তাঁর নিজের ঝুঁকির কথা ভাবছেন না। আমাদের দেশেও দেখছি এই মহাসংকটকালে চরম ঝুঁকি নিয়েও আমাদের চিকিৎসকবৃন্দ ও স্বাস্থ্যকর্মীরাও অনন্য কর্তব্যবোধের নজির সৃষ্টি করছেন। তাঁদের এই সাহসী কর্ম ও কর্তব্যবোধ আমাদের সবাইকে গর্বিত করছে। একই সঙ্গে তাঁদের এই মানবিক ধ্যান ও কর্ম আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে আমার ফেলে আসা দিনগুলোতে। আমার শৈশব-কৈশোরে।


আমি একজন চিকিৎসক পিতার সন্তান। বাবা একজন রাজনীতিবিদ হলেও পেশায় ছিলেন চিকিৎসক। শৈশব-কৈশোরে দেখার সুযোগ হয়েছে একজন চিকিৎসক নিজেকে কীভাবে কর্ম ও কর্তব্যে নিবেদিত থাকেন। জ্ঞান হওয়ার পর থেকেই বাবাকে দেখেছি সরকারি দাতব্য চিকিৎসালয়ে রোগী দেখা শেষ করে নিজের চেম্বারে বসতেন। আবার রোগী দেখতেন। এখন আমার বয়স ষাট পেরিয়েছে। আমি আমার শৈশব-কৈশোরে দেখেছি, গ্রামে গ্রামে কলেরা আর ম্যালেরিয়ার প্রাদুর্ভাব ছিল ব্যাপক। কলেরা রোগী দেখে আসার পর বাবাকে দেখতাম, প্রথমে গায়ের কাপড়চোপড় ধুতে দিতেন, তারপর ভালোভাবে গোসল করে তবেই আমাদের কাছে আসতেন। অর্থাৎ সংক্রামক কোনো ব্যাধি থেকে অপরকে ও নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে হলে, সামাজিক ও শারীরিক দূরত্ব এবং কিছু অনিবার্য সচেতনতা তখনো অপরিহার্য ছিল।

১৯৭১ সালে স্বাধীনতাযুদ্ধ শুরু হয়। সে সময়ের অনেক কিছুই স্মৃতিতে সজীব রয়েছে। আমরা সপরিবার আশ্রয় নিই ভারতের মেঘালয় রাজ্যের তুরা জেলার অধীন মহেশখলা নামক স্থানে গারো পাহাড়ের পাদদেশে। তখন বাবা ছিলেন প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য ও পরে গণপরিষদ সদস্য। আমি আমার অনেক প্রবন্ধেই লিখেছি, মহেশখোলায় গড়ে ওঠা ইয়ুথ ও এফএফ ক্যাম্পের ইনচার্জ ছিলেন আমার বাবা ডা. আখকুল হোসাইন আহমেদ। যেহেতু বাবা পেশায় ছিলেন একজন চিকিৎসক, তাই শরণার্থীদের রোগবালাই প্রতিরোধ এবং তাদের চিকিৎসার ব্যবস্থাপনাটি তিনিই দেখভাল করতেন। তাঁর সঙ্গে থাকতেন আরও দু-তিনজন সহযোগী চিকিৎসক। শরণার্থীশিবিরে অবস্থানকারীরা অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্টের মধ্য দিয়ে দিনাতিপাত করত। গারো পাহাড়ের বনজঙ্গল পরিবেষ্টিত স্থানের কোথাও কোনো নলকূপ ছিল না আজ থেকে প্রায় অর্ধশত বছর আগে। ছড়া বা ঝরনাই ছিল পানীয় জলের উৎস। ভারত সরকারের দেওয়া কিছু পানি বিশুদ্ধকরণ বড়ি মিশিয়ে ওই পানি খেতে হতো আমাদের সবার। ওই সময় পানি বিশুদ্ধকরণ ব্লিচিংয়ের গন্ধযুক্ত বড়িই আমাদের কাছে ছিল প্রাণরক্ষাকারীর মতো।

শরণার্থীশিবিরগুলোতে অবস্থানকারী মানুষের মধ্যে স্বাস্থ্যসচেতনতা বৃদ্ধির চেষ্টা করেও কলেরার করাল গ্রাস থেকে মহেশখোলা শিবিরে আশ্রয় নেওয়া অনেককেই তখন রক্ষা করা যায়নি। শরণার্থীদের অধিকাংশই ছিল সমাজের অনগ্রসর শ্রেণির মানুষ। তারা ততটা স্বাস্থ্যসচেতনও ছিল না। তবে স্থানীয় গারো সম্প্রদায়ের লোকেরা কলেরার ভয়ে এবং মাছি থেকে দূরে থাকার জন্য অপেক্ষাকৃত উঁচু পাহাড়ের চূড়ায় তাদের ক্ষণস্থায়ী আবাস তৈরি করত। বাবাকে দেখেছি একজন চিকিৎসক হিসেবে কলেরায় আক্রান্তদের বাঁচানোর জন্য প্রাণান্তকর চেষ্টা করতে। ভারতীয় সীমান্ত রক্ষায় নিয়োজিত বিএসএফের মাধ্যমে জেলা শহর তুরায় খবর পাঠিয়ে স্যালাইনসহ চিকিৎসার প্রয়োজনীয় ওষুধ আনার চেষ্টা করতেন। সেই সময় বাবার এসব মানবিক কর্মের মধ্যে একজন আদর্শ ও নৈতিক চিকিৎসকের চিরন্তন চিত্র প্রতিফলিত হতে দেখেছি।

কলেরা একসময় আমাদের দেশেও মহামারির রূপ নিয়েছিল। মুরব্বিদের কাছে শুনেছি, তখন গ্রামকে গ্রাম মানুষশূন্য হয়ে পড়ত কলেরার করাল গ্রাসে। কলেরা মহামারি থেকে নিরাপদ থাকতে ছুটে বেড়াত মানুষ । কলেরা রোগটি অঞ্চলভিত্তিক কিংবা আমাদের এই বাংলাদেশ বা ভারতের কিছু অঞ্চলে ছিল এই রোগের প্রাদুর্ভাব। কিন্তু কোভিড-১৯-এর ভয়াল গ্রাস ধনী-দরিদ্র সব দেশেই দৃশ্যমান। আজ আমরা করোনা বা কোভিড-১৯-এর ভয়াল ছোবলের আরও একটি মহামারি প্রত্যক্ষ করছি। এ রকম এক বৈশ্বিক মহামারিতে এক দেশের করোনা রোগীর অন্য দেশে গিয়ে চিকিৎসা নেওয়ারও কোনো সুযোগ নেই। মহামারির এই দুঃসময়ে এখন সবচেয়ে কাছের মানুষটি হচ্ছেন ডাক্তার সাহেব ও তাঁর সহযোগী অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী।

একজন রোগী ডাক্তারকে দেখে, তাঁর রোগীবান্ধব কথা শুনে অর্ধেক সুস্থতা বোধ করেন। বিভিন্ন পোস্ট ও খবরাখবর পড়ে যতটুকু বুঝেছি যে এ রোগটিতে মৃত্যুর হার খুব বেশি নয়, শতকরা ২ থেকে ৩ শতাংশ কিন্তু এর সংক্রমণের সক্ষমতা খুব বেশি। এই কারণে পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই এর বিস্তৃতি ঘটেছে এবং এখনো ঘটে চলেছে। ফলে জনজীবনকে সুরক্ষিত রাখতে বিশ্বের প্রায় সব দেশ লকডাউনে অবরুদ্ধ। এমন একটি নাজুক পরিস্থিতিতে আমাদের ডাক্তার সাহেবদেরকে অনেক বেশি দায়িত্ববান হতে হবে। হয়ে উঠতে হবে অনেক বেশি নিবেদিত, মানবিক ও সাহসী। সেই সঙ্গে চিকিৎসকদের পর্যাপ্ত ব্যক্তিগত সুরক্ষার বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে। কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই এটি দেখতে হবে। ইতিমধ্যে সরকার চিকিৎসার কাজে নিয়োজিতদের জন্য উল্লেখযোগ্যসংখ্যক সুরক্ষা সরঞ্জামাদি সরবরাহ করেছেন বলে বিভিন্ন গণমাধ্যম থেকে জানা যায়। এগুলোর যেন অপব্যবহার না হয়। অর্থাৎ চিকিৎসক বা নার্সদের সুরক্ষার পোশাক ব্যাংক কর্মকর্তা বা একজন সমবায় কর্মকর্তা যাঁর প্রয়োজন নেই, তিনি যেন ব্যবহার না করেন। এটি নিশ্চিত করা না হলে দেখা যাবে সুরক্ষা পোশাকের অভাবে চিকিৎসকেরা, স্বাস্থ্যকর্মীরা রোগীর কাছে যেতে পারছেন না। গেলেও তাঁরা সুরক্ষিত থাকছেন না। তাই পিপিই ব্যবহারে আমাদের সচেতন হতে হবে।

প্রতিদিন সারা দেশে বাড়ছে কোভিড-১৯ ভাইরাসে আক্রান্তের গ্রাফ। সংক্রমণের এই অবস্থা কোথায় গিয়ে কবে থামবে, আমরা কেউ বলতে পারছি না। ডাক্তার ভাই ও বোনদের জানা আছে, তারপরও একটি কথা বলতে চাই। বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর প্রত্যেক বিচারপতিকেই শপথ নিতে হয়েছে দেশের সংবিধান সমুন্নত রাখার জন্য। যেকোনো পরিস্থিতিতে আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে দেশের সাংবিধানিক ব্যবস্থাকে সুরক্ষা দেওয়া ও রাষ্ট্রীয় আইনকেও সুরক্ষা দেওয়া। সামরিক বাহিনীতে যাঁরা চাকরি করেন, তাঁরা শপথ নেন দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করার জন্য। বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে দেশকে, দেশের সার্বভৌমত্বকে রক্ষার জন্য তাঁরা তাঁদের জীবন পর্যন্ত ত্যাগ করতে প্রস্তুত মর্মে শপথ নিয়ে থাকেন। চিকিৎসক ভাইবোনদেরও একটি শপথ আছে। সহজ বাংলায় বললে, ‘আমি পবিত্র মনে এই মর্মে শপথ করছি যে আমি দেশ সেবায় তথা মানবতার সেবায় আত্মনিয়োগ করব। আমার অর্জিত জ্ঞান কখনোই মানবতার বিরুদ্ধে ব্যবহার করব না বরং আমার পেশাগত জ্ঞান লাভের শুরু থেকেই মানবজীবনের প্রতি অবিচল শ্রদ্ধাশীল থাকব।’

নিজ বিবেকের কাছে জবাবদিহিই সবচেয়ে বড় শপথ। একজন চিকিৎসক তাঁর পেশাজীবনের শুরু থেকেই অর্জিত পেশাগত জ্ঞান মানবকল্যাণে নিবেদিত করার শপথ নেন। আমাদের জানা প্রয়োজন এই কোভিড-১৯ মোকাবিলা করার মতো যথেষ্টসংখ্যক অগ্রসৈনিক (চিকিৎসক) আমাদের আছে কি না। যদি না থেকে থাকে, তাহলে আরও চিকিৎসক জরুরি ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া প্রয়োজন। আর কোনো চিকিৎসকই যেন আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত অবসর না নেন, সে জন্য তাঁদেরকে অনুরোধ জানানো দরকার—তাঁরা যে বিভাগের চিকিৎসকই হোন না কেন। প্রয়োজনবোধে তাঁদের অতিরিক্ত সময়কাল কাজ করার জন্য বিশেষ আর্থিক সম্মানীর ব্যবস্থা করা যেতে পারে। ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে আমরা বিশ্বাস করি, জীবন ও মৃত্যুর ওপর মানুষের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। তবে মহান সৃষ্টিকর্তা কর্তৃক প্রদত্ত মেধা ও জ্ঞান অর্জন করে একজন চিকিৎসক মানবিক সেবার মানসিকতা ও ব্রত হৃদয়ে ধারণ করেই রোগীকে রোগমুক্ত করার সবটুকু চেষ্টা করবেন। এটিও মহান সৃষ্টিকর্তারই নির্দেশ এবং একজন চিকিৎসকের শপথেরও মর্মবাণী।

চিকিৎসক পিতার সন্তান হিসেবে বর্তমান চিকিৎসকদের বিনীতভাবে বলতে চাই, আপনারা আমাদের ভাইবোনের মতো। অনুগ্রহ করে সেবার ব্রত নিয়ে এগিয়ে আসুন, অসুস্থ রোগীর পাশে দাঁড়ান। আপনার এই দাঁড়ানোটাই একজন মুমূর্ষু রোগীকে অর্ধেক রোগমুক্ত করবে। সারা জাতি আজ আপনাদের দিকে তাকিয়ে। সমগ্র দেশবাসী আপনাদের সুস্বাস্থ্যের জন্য মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রতিনিয়ত প্রার্থনা করছে। একজন চিকিৎসক দশজন মুমূর্ষু রোগীকে সারিয়ে তুলতে পারেন। দশটি পরিবারের মুখে ফুটিয়ে তুলতে পারেন হাসি। চিকিৎসকেরা তাঁদের পরিবার-পরিজন নিয়ে সুস্থ জীবন যাপন করুন; দেশের মানুষ সে প্রার্থনাও করে।

মানবকুল এক নিকষ অমানিশায় নিমজ্জিত। এর মধ্যে আমাদের দেশেই অনেক চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন সেবা ও চিকিৎসা দিতে গিয়ে। সব ঝুঁকিকে তাঁরা অগ্রাহ্য করছেন। অপর্যাপ্ত সুরক্ষা ব্যবস্থাকে তাঁরা আমলে নেননি। কী অদম্য সাহসী যোদ্ধা তাঁরা! তাঁরা কেবল চিকিৎসক নন, তাঁরা প্রত্যেকে সাহসী বীর। দুঃসময়ে আক্রান্ত মানুষের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে গিয়ে আজ তাঁরাই আক্রান্ত। তারপরও এই যুদ্ধে জয়ী হতে হবে, হতেই হবে। এই যুদ্ধ শেষে পুরো বিশ্ব ও মানবজাতি পরিশুদ্ধ হবে। চারপাশের আকাশ-বাতাস আবার আলোয় হাসবে। জন্ম হবে নতুন এক পৃথিবীর। মহান সৃষ্টিকর্তার অপার অনুগ্রহে মানবজাতি এগিয়ে যাবেই, জয়ী হবেই। এ বিষয়টি সবাইকে হৃদয়ে ধারণ করতে হবে। বর্তমান সংকটকালে একজন চিকিৎসকের দায়িত্ব মহাসমুদ্রের বুকে ঝড়ে আক্রান্ত কোনো জাহাজের একজন সুদক্ষ ক্যাপ্টেনের মতো। তাই চিকিৎসকদের উদ্দেশে বলতে চাই, আপনাদের দায়িত্ব অপরিসীম। মনে রাখতে হবে,

‘এ তুফান ভারী, দিতে হবে পাড়ি,
নিতে হবে তরী পার।’

বিচারপতি ওবায়দুল হাসান: হাইকোর্টের বিচারপতি


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply