থানা পুলিশ ও পিবিআইয়ের যেখানে শেষ, সিআইডি পুলিশের সেখানেই শুরু?

নিহতের স্ত্রী ও ছেলের অভিযোগ,আগের তদন্তকারী কর্মকর্তারা আসামীদের কাছে থেকে টাকা নিয়ে তাঁদের বাঁচাতে চেস্টা করেছিল

চার বছর আগে জবাই করে খুন হয়েছিল ঝিনাইদহের হরিনাকুন্ডু উপজেলার ভালকি গ্রামের চরমপন্থী দলের সদস্য আনেয়ার হোসেন আনু। থানা পুলিশ ও পিবিআই খুনিদের খুজে না পেলেও সিআইডি খুনিদের গ্রেপ্তার করতে পেরেছে
  • 5.7K
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    5.7K
    Shares

হাবিবুল্লাহ মিজান, সম্পাদক, অল ক্রাইমস টিভি

চার বছর আগে জবাই করে খুন হয়েছিল ঝিনাইদহের হরিনাকুন্ডু উপজেলার ভালকি গ্রামের চরমপন্থী দলের সদস্য আনেয়ার হোসেন আনু। হরিনাকুন্ডু থানা পুলিশের হাত ঘুরে মামলার তদন্তভার আসে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) কর্মকর্তা এসআই ইসমাইল হোসের উপর।

এর আগে তদন্তকালে হরিনাকুন্ডু থানা পুলিশ গ্রেপ্তার করে আবুল গনি নামের একজনকে। পিবিআই গ্রেপ্তার করে আইয়ুব আলী নামে একই এলাকার আরেকজনকে। তাঁরা বিনা দোষে জেলও খাটেন দীর্ঘদিন। পরে তাঁদের বিরুদ্বে খুনের কোন প্রমাণ না পাওয়ায় আদালত তাঁদের জামিন দেন।

জবাই করা খুন হলেও পিবিআই কর্মকর্তা এসআই ইসমাইল হোসেনও খুনিদের সনাক্ত না করতে পেরে আদালতে চুড়ান্ত রিপোর্ট প্রদান করেন।

কিন্তু খুনিদের বিচারের মুখোমুখি করার জন্য নিহতের স্ত্রী বিউটি বেগম আদালতে আবেদন করেন। সেই আবেদনের প্রেক্ষিতে মামলার পুনঃতদন্তভার আসে সিআইডি পুলিশের উপর। অবশেষে  আনু হত্যার দীর্ঘ চার বছর পর রহস্য উদঘাটন করে সিআইডি।

এই হত্যা মামলায় সাহেব আলী,শাহিন কবির ঝলক এবং রাশিদুর ইসলাম কুটি নামের তিন আসামীকে গ্রেপ্তার করেছে। কিন্তু এখনো ধরাছোয়ার বাইরে আছে খুনের মূল হোতা। খুনের অন্যতম তিন আসামীদের গ্রেফতার করে আইনের কাছে সোপর্দ করেছে বলে অল ক্রাইমস টিভির কাছে সিআইডি পুলিশের ঝিনাইদহের বিশেষ পুলিশ সুপার রেশমা শারমিন নিশ্চিত করেন শনিবার রাতে।

জানা গেছে ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারী মাসের ৩ তারিখ রাতে আনুকে হাত-পা বেধে জবাই করে গ্রামের ফাকা মাঠের ভিতর রেখে যায় দূর্বৃত্তরা। ঘটনার পরের দিন নিহত আনুর স্ত্রী বিউটি বাদী হয়ে হরিনাকুন্ডু থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলা নং-০৩,তাং০৪/০২/১৬। থানায় মামলা করার পরে সন্দেহভাজন আসামী ওসমান গনিকে গ্রেপ্তার করলেও খুনের রহস্য উদঘাটন করতে ব্যার্থ হয় হরিনাকুন্ডু থানা পুলিশ। আদালতে চুড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন তদন্তকারী কর্মকর্তা। আদালতে বাদীর নারাজি আবেদনের প্রেক্ষিতে মামলাটি পুনঃতদন্ত করার জন্য দায়িত্ব দেন  বাংলাদেশ পুলিশের বিশেষায়িত সংস্থা পিবিআইয়ের উপর।

কিন্তু পিবিআই তদন্ত শেষে খুনিদের সনাক্ত না করতে পেরে আবারো আদালতে চুড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করে। স্বামীর খুনিদের সনাক্তের দাবিতে আদালতে আবারো নারাজী আবেদন করেন নিহতে স্ত্রী বিউটি। তাঁর আবেদনের প্রেক্ষিতে আদালত ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরের ৫ তারিখে মামলার পুনঃতদন্তভার হস্তান্তর করে সিআইডি পুলিশের উপর।

মামলা তদন্ত কাজ হাতে পেয়েই সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার রেশমা শারমিন নিয়োগ দেন এসআই মাসুদুর রহমান নামের দক্ষ একজন কর্মকর্তাকে।

তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করেই দায়িত্ব শেষ করেননি তিনি। মামলার রহস্য উদঘাটনকে চ্যালেঞ্জ হিসাবে নিয়ে নেন। মেধাবী এবং ক্লিন ইমেজের পুলিশ অফিসার হিসাবে পরিচিত রেশমা শারমিনের নির্দেশে শুরু হয় নিবিড় তদন্ত।

কখনো ধান কাটার শ্রমিক,কখনো আইসক্রিম বিক্রেতা হিসাবে ঝিনাইদাহ জেলার বিভিন্ন গ্রামে,হাট-বাজারে ঘুড়ে গোপন তথ্য সংগ্রহ করতে থাকে এস আই মাসুদ রানা। কিন্ত ভয়ে খুনিদের বিরুদ্বে কেউ মুখ খুলতে চাইছিলেন না।

এভাবে ছদ্মবেশে ঘুড়ে বেড়িয়ে একদিন পেয়ে যায় ঘটনার মুল রহস্য। বের হয়ে আসে রক্ত জমাট বাধার মতো খুনের আদ্যপান্ত।

থানা পুলিশ এবং পিবিআই যাকে মামলার স্বাক্ষী হিসাবে একাধিকবার স্বাক্ষী নিয়েছে,সেই পলাতক আসামীকেই খুনের মূল নায়ক হিসাবে সনাক্ত করে সিআইডি। সে নিহত আনুর ঘনিষ্ঠ আত্মীয় ছিলেন।

সিআইডি পুলিশ প্রথমে গ্রেপ্তার করে সাহেব আলী নামের একজনকে। খুনের পর পরই এলাকা থেকে পালিয়েছিল এই সাহেব আলী।

কিন্তু গ্রেপ্তারের পরে তাঁকে বারবার জিজ্ঞাসাবাদ করলেও সে মুখ খুলতে চাইনি। কিন্তু এসআই মাসুদের সামনে সে বারবার পানি খেতে চাচ্ছিল। শরীর দিয়ে ঘাম বেড় হচ্ছিল। এই সব লক্ষন দেখেই দক্ষ তদন্তকারী কর্মকর্তা এস আই মাসুদ নিশ্চিত হন যে, আসামী সাহেব আলী এই খুনের সব ঘটনা জানে। এক পর্যায়ে সব খুলে বলে সিআইডি পুলিশের কাছে। সে স্বীকার করে যে নিহত আনুর এক আত্মীয় তাঁকে দিয়ে আনুকে বাড়ি থেকে মাঠে ডেকে আনে। মাঠে আনার পরেই তিনজন মিলে প্রথমে ঝাপটে ধরে আনুকে। হাত-পা বেধে ফেলে। পলাতক আসামী এবং কুটি নিহত আনুর বুকে উঠে বসে। এরপর জবাই করে ঝলক। ঝলক ভাড়াটে খুনি হিসাবে কাজ করে। খুন করে লাশ ফেলে আসে মাঠেই। এদিকে খুনের মূল নায়ক আত্মীয়তার সুযোগে মিশে যায় নিহত আনুর পরিবারের সাথেই। বাদীকে আদালতেও বিভিন্ন লোকের নামে মামলা দায়ের করাই। তাঁর ঘনিষ্ঠ এক আইনজীবীকে দিয়ে মামলা পরিচালনা করাতে থাকে।

থানা পুলিশ ও পিবিআই তাঁকে স্বাক্ষী হিসাবে সাক্ষ্যও নেয়। কিন্তু সিআইডি পুলিশের কাছে নিজের অপরাধ লুকিয়ে রাখতে পারেনি সে। যদিও একাধিকবার সিআইডি পুলিশের ঝিনাইদাহ অফিসেও গিয়েছে মূল খুনিদের আড়াল করার গোপন মিশনে। কিন্তু এবার শেষ রক্ষা হবে না বলে জানা গেছে। কারন সিআইডি পুলিশ ইতিমধ্যেই জেনে গেছে আনু খুনের ঘটনার আদ্যপান্ত। খুনের সাথে তাঁর জড়িত থাকার সব প্রমাণও এখন সিআইডির হাতে।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই মাসুদ রানা অল ক্রাইমস টিভিকে জানান, মামলা রহস্য উদঘটন করে তিন জন আসামিকে গ্রেফতার করে আদালতের নিকট সোপর্দ করেছি।

তিনি আরো বলেন, আমি ও এসআই সেলিম রেজা অভিযান চালিয়ে গত ১৭ ই জুন আসামি সাহেব আলীকে প্রথমে কুষ্টিয়া জেলার ঝাউদিয়া বাজার নামক স্থান থেকে গ্রেপ্তার করি।

সাহেব আলী হত্যার সাথে সম্পৃক্ত থাকার কথা স্বীকার করে ঝিনাইদাহ জেলার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিট্রেট তানিয়া বিনতে জাহিদের আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করে।

তিনি আরো বলেন সাহেব আলীর দেয়া তথ্যে বাকি পলাতক আসামীদের গ্রেফতারের জন্য পুলিশ পরিদর্শক তোফাজ্জেল হোসেনের নেতৃত্বে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে ভাড়াটে খুনি ঝলক ও কুটিকেও গ্রেপ্তার করি।

আসামীদের আদালতে প্রেরণ করলে আদালত তাদেরকে জেলহাজতে প্রেরন করে।

মামলার তিন আসামী আসামী এবং নিহত আনু এক সময় নিষিদ্ব ঘোষিত চরমপন্থী দলের সদস্য ছিল। নিহত আনুর আপন বড় ভাই হাকিম আলীও চরমপন্থী দলের নেতা ছিল। প্রায় ২০ বছর আগে প্রতিদ্বন্দ্বী গ্রুপ গুলি করে খুন করে হাকিম আলীকে। এই খুনে পূর্বে গ্রেপ্তার হওয়া আসামী ওসমান গনি এবং আইয়ুব আলীর পরিবারের লোক আসামী ছিল। ভাই হত্যার প্রতিশোধ নিতে আনু নিজেও গোপনে যোগ দেয় চরমপন্থী দলে। আধিপত্য বিস্তার নিয়ে ২০০৩ সালে খুন করে চরমপন্থী দলের নেতা আরেক নেতা গোলাম আলীকে।

এলাকাবাসী সূত্রে জানা যায়,ঝলকের বিরুদ্ধে হত্যা, চাদাবাজি ও বিষ্ফোরক ও হত্যা মামলা পূর্বের একাধিক মামলা আছে। এলাকাবাসী আরো জানান দীর্ঘদিন যাবৎ বিভিন্ন সময় এলাকার মানুষের নিকট চাঁদা দাবী করে এবং ভয়ভীতি দেখিয়ে চাঁদা আদায় করলেও তাদের ভয়ে এলাকায় কেউ পুলিশের কাছে মুখ খুলতে রাজি হন না। তবে তাদের বিরুদ্ধে এলাকার ভুক্তভোগী মানুষ হরিনাকুন্ডু থানায় সাধারন ডায়েরী করেছেন বলে জানা যায়।

মামলার বাদী বিউটি এবং তাঁর ছেলে সোহান অভিযোগ করে ,আগের তদন্তকারী কর্মকর্তারা আসামীদের কাছে থেকে টাকা নিয়ে তাঁদের বাঁচাতে চেস্টা করেছিল হয়তো।

এই বিষয়ে মামলার সাবেক তদন্তকারী কর্মকর্তা পিবিআইয়ের এসআই ইসমাইল হোসেন বলেন, তাঁর বিরুদ্বে বাদীর অভিযোগ ভিত্তিহীন।

আসামীদের কাছে থেকে টাকা নেয়ার প্রশ্নই উঠে না বলে তিনি দাবী করেছেন।

মূল খুনিদের গ্রেপ্তারের ব্যর্থতার বিষয়ে তিনি বলেন,আমি তদন্তকালে যা পেয়েছি,সেটাই আদালতে জমা দিয়েছি।

থানা পুলিশ এবং পিবিআই মূল আসামীদের সনাক্তে ব্যর্থতার পরে অল্প কিছুদিনেই ক্লুলেস মামলার আসল রহস্য উদঘাটনকে সিআইডি পুলিশের বিশাল সফলতা  দাবী করে সিআইডির ডিআইজি শেখ নাজমুল আলম বলেন,“ আমরা সব মামলার রহস্য উদঘাটনকে চ্যালেঞ্জ হিসাবে নেয়।”

বিশেষ পুলিশ সুপার রেশমা শারমিন এবং তদন্তকারী কর্মকর্তার ভূয়সী প্রশংসা করে তিনি আরো বলেন,আমরা প্রতিটি মামলাকেই খুবই গুরত্বের সাথে তদন্ত করি বলেই রহস্য  দ্রুত উদঘাটন সম্ভব হয়।

আরেক প্রশ্নের জবাবে ডিআইজি শেখ নাজমুল আলম বলেন, দ্রুতই আনু হত্যার চার্জশিট দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।


  • 5.7K
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    5.7K
    Shares
  •  
    5.7K
    Shares
  • 5.7K
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply