‘এই এ-প্লাস লাগবে,এ-প্লাস’ বলে এ-প্লাস গুরুর ডাকতো এসএসসি পরীক্ষার্থীদের

সিআইডি পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়ে এ-প্লাস গুরু জেলে, এসএসসির রেজাল্ট পাল্টে দেয়ার মিথ্যা আশ্বাসে কোটি টাকা আয়ের টার্গেট ছিল মনিরের

সিআইডি পুলিশের হাতে ধরা পড়ে কথিত এ-প্লাস গুরু মনির এখন জেলে বন্দি। তাঁর কথিত প্রেমিকাও পলাতক

হাবিবুল্লাহ্ মিজান,সম্পাদক,অল ক্রাইমস টিভি

ঝিনাইদাহ জেলার শৈলকুপা উপজেলার মির্জাপুর ইউনিয়নের গোলকনগর গ্রামের জামাল বিশ্বাস ও ফরিদা বেগম দম্পতির ছেলে মোঃ মনিরুজ্জামান। বয়স মাত্র চব্বিশ। নিজে কিংবা পরিবারের কেউ কোন পরীক্ষায় এ-প্লাস তো দুরেই থাক, পাশের মুখই দেখতে পারেনি।

কিন্তু ফেসবুকে এই মনির এরই মাঝে ‘এ-প্লাস গুরু’ হিসাবে ব্যাপক নাম কামিয়েছে।

এই বছরের এসএসসি পরীক্ষার রেজাল্ট মোবাইলে প্রকাশকে কেন্দ্র করে কোটি টাকা আয়ের টার্গেট ছিল এই কথিত এ-প্লাস গুরুর। স্বপ্ন ছিল আগামী মাসেই প্রেমিকাকে বিয়ে করে চোরা পথে ভারত যাবে তাজমহল দেখতে।

কিন্তু বেরসিক সিআইডি পুলিশের হাতে ধরা পড়ে সে এখন জেলে বন্দি। তাঁর কথিত প্রেমিকাও পলাতক বলে অস্থানীয় সুত্রে জানা গেছে।

সিআইডি পুলিশের হাতে ধরা পড়ে কথিত এ-প্লাস গুরু মনির এখন জেলে বন্দি। তাঁর কথিত প্রেমিকাও পলাতক

এসএসসি পরীক্ষায় এ-প্লাস পাইয়ে দেওয়ার নামে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার মিশনে নেমে পড়া এই প্রতারক মনির নিজেকে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের ফলাফল প্রস্তুতের সঙ্গে সম্পৃক্ত পরিচয় দিতো। এভাবে মানুষের আস্থা অর্জন করেছিল রাতারাতি। খারাপ ফলাফল পরিবর্তন করে এ-প্লাস করে দেয়ার জন্য কয়েকজনের থেকে মোটা অংকের টাকাও নিয়েছিল। কিন্তু টাকা পাওয়ার পর ভিকটিমদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্লক করে দিতেন তিনি। তাই কেউ তাঁকে আর খুঁজেও পেতো না। তাতেও শেষরক্ষা হয়নি। সিআইডি পুলিশ তাঁর সমস্ত পরিকল্পনা ভেস্তে দেয়। গত বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে শৈলকূপা থেকে গ্রেফতার করা হয় মনিরকে। অল ক্রাইমস ডট টিভির সাথে কথা সিআইডির ডিআইজি শেখ নাজমুল আলম এই প্রতারককে গ্রেপ্তারের তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, এ-প্লাস পাইয়ে দেওয়ার মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে ফেসবুক ব্যবহার করে প্রতারণা করে আসছিল মনির। সিআইডির সাইবার পুলিশের প্রযুক্তিগত সহায়তায় সিআইডি ও জেলা পুলিশ তাকে গ্রেফতার করেছে।

ঝিনাইদাহ জেলার শৈলকুপা উপজেলার মির্জাপুর ইউনিয়নের গোলকনগর গ্রামের জামাল বিশ্বাস ও ফরিদা বেগম দম্পতির ছেলে কথিত এ-প্লাস গুরু মোঃ মনিরুজ্জামান এই এ-প্লাস লাগবে,এ-প্লাস বলে ডাকতো এসএসসি পরীক্ষার্থীদের

ডিআইজি শেখ নাজমুল আলম জানান, সিআইডি যশোর ও কুষ্টিয়া বিভাগের বিশেষ পুলিশ সুপার শামসুল আলম এবং পুলিশ সুপার রেশমা শারমিনের তত্তাবাধনে ও সার্বিক সহযোগিতায় সিআইডি ঝিনাইদহর পুলিশ পরিদর্শক কাজল কুমার শর্মার নেতৃত্বে সঙ্গীয় এসআই  মোঃ মাসুদ রানা, এএসআই মহাসীন আহমেদ, এএসআই  মোঃ মইনুল ইসলাম ও ঝিনাইদহ জেলা পুলিশের টিম বৃহস্পতিবার রাত ১১.৩৫ টায় মনিরকে  নিজ এলাকা হতে মনিরকে গ্রেফতার করে। এই সময় তার ব্যবহৃত ইলেকট্রনিক ডিভাইসও জব্দ করে সিআইডি।

প্রাথমিক জিজ্ঞাবাদে মনির ফেসবুকে মিথ্যা তথ্য উপস্থাপন এবং প্রতারণার মাধ্যমে একাধিক ভিকটিমের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার কথা স্বীকার করে।

মনিরের বিরুদ্ধে ঝিনাইদহ জেলার শৈলকুপা থানায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা দায়ের করা হয়েছে।

সিআইড সূত্র জানাই, গত ২২ শে মার্চ থেকে  থেকে ২৬ শে মে পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে এ বছরের এসএসসি পরীক্ষায় কেউ খারাপ রেজাল্ট করলে তাকে সাহায্য করার আশ্বাস দিয়ে ফেসবুকে পোস্ট দেয় প্রতারক মনির। সরকার তিন হাজার হাজার নার্স নিয়োগ করবে, এই ব্যাপারেও সে সাহায্য করতে পারবে বলে দাবী করে। এই কাজে তার ব্যবহৃত ফেসবুক একাউন্টের টাইমলাইনে ঢুকলেই তাঁর প্রতারণার সম্পর্কে বিস্তারিত  জানা যায়।

গত ২৬ শে মে সে লিখে, এসএসসির রেজাল্ট ৩১ তারিখে। যাদের রেজাল্ট খারাপ হবে, তারা ইনবক্সে এসএমএস দিও। আমি সাহায্য করার চেস্টা করবো।

এর আগে ১১ মে একটি ফেসবুক পোস্টে লিখে,” সরকার তিন হাজার নার্স নিয়োগ করবে। এই ব্যাপারে কারো কোন হেল্প লাগলে ইনবক্স করবেন।

গত ৯ এ মে আরেকটি পোস্টে সে লিখে এসএসসির পরীক্ষার রেজাল্ট চেঞ্জ করতে চাইলে ইনবএক্সে এসএমস দাও। প্রতারণার কৌশল সম্পর্কে ডিআইজি শেখ নাজমুল আলম জানায়,ফেসবুকে এসএসসি পরীক্ষা খারাপ হলেও পাস করিয়ে দেওয়া, ফলাফল আফগ্রেড করা ও এ-প্লাস পাইয়ে দেওয়ার মিথ্যা প্রতিশ্রুতি প্রচার করছিল মনির। হাসান মাহমুদ নামে ফেইক ফেসবুক আইডির মাধ্যমে নিজেকে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের ফলাফল প্রস্তুত কাজে নিয়োজিত ব্যক্তি হিসেবে পরিচয় দিতেন তিনি। যাদের পরীক্ষা খারাপ হয়েছে, ফলাফল পরিবর্তন করতে চায় বা এ-প্লাস পেতে আগ্রহী, তাদের ইনবক্সে যোগাযোগের আহ্বান জানাতেন। আগ্রহীরা ইনবক্সে যোগাযোগ করলে ভিন্ন ভিন্ন কাজের জন্য ভিন্ন অঙ্কের টাকা দাবি করতেন। ভিকটিমের কাছ থেকে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার পর ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে ব্লক করে দেওয়া হতো।

এই বিষয়ে সিআইডির সাইবার বিভাগের প্রধান ডিআইজি শাহ আলম বলেন, ফলাফল পরিবর্তন করার জন্য একেক জনের কাছ থেকে পনের হাজার টাকা কিংবা তার বেশি করে টাকা নিতেন মনির।

যদিও আমাদের জানা মতে এভাবে রেজাল্ট পরিবর্তন করা কোনভাবেই সম্ভব না,তিনি আরো যোগ করেন।

ডিআইজি শেখ নাজমুল আলম বলেন, হাসান মাহমুদ আইডিটি ফেক ছিল। সিআইডির সাইবার পুলিশ ফেক ফেসবুক আইডির মালিক ও তার অবস্থান শনাক্ত করে। এরপরই অভিযান চালিয়ে তাকে আটক করা হয়।

ফেসবুক বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফলাফল পরিবর্তন বা প্রশ্নফাঁসের বিজ্ঞাপন দেখে অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের প্রতারণার ফাঁদে পা না দেওয়ার আহ্বান জানান সিআইডির এই উর্ধতন কর্মকর্তা। তিনি বলেন, আমি ব্যক্তিগতভাবে প্রশ্নফাঁস বা এ সংক্রান্ত প্রতারণার বিরুদ্ধে কাজ করছি। প্রতারকরা মানুষের সরলতা ও লোভকে পুঁজি করে ফাঁদ পাতে। এ ধরনের ফাঁদে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের পা দেওয়া উচিত নয়।

 

Facebook Notice for EU! You need to login to view and post FB Comments!

1 COMMENT

Leave a Reply