এই মুহুর্তে পাওয়া..
Home / সম্পাদকের নির্বাচিত / ৩ লক্ষ ২৫ হাজার টাকা এবং একজন সৎ মানুষের গল্প

৩ লক্ষ ২৫ হাজার টাকা এবং একজন সৎ মানুষের গল্প

ছবির বাম থেকে প্রতিবেদক হাবিবুল্লাহ মিজান, মধ্যে লন্ডন প্রবাসী শামীম আহমেদ চৌধুরী যিনি টাকা হারিয়েছিলেন। শেষে বাংলাদেশ বিমানের কেবিন ক্রু  কাজী মো. আশরাফ আল কাদের,যিনি টাকা পাওয়ার পরে অনেক কস্টে নিজেঢ় উদ্যোগে মালিককে খুঁজে বের করে প্রায় ৩ লক্ষ ২৫ হাজার টাকা ফেরত দিয়েছেন।

ছবির বাম থেকে প্রতিবেদক হাবিবুল্লাহ মিজান, মধ্যে লন্ডন প্রবাসী শামীম আহমেদ চৌধুরী যিনি টাকা হারিয়েছিলেন। শেষে বাংলাদেশ বিমানের কেবিন ক্রু কাজী মো. আশরাফ আল কাদের,যিনি টাকা পাওয়ার পরে অনেক কস্টে নিজেঢ় উদ্যোগে মালিককে খুঁজে বের করে প্রায় ৩ লক্ষ ২৫ হাজার টাকা ফেরত দিয়েছেন।

হাবিবুল্লাহ মিজান, এডিটর, অল ক্রাইমস টিভি, ঢাকাঃ
এতো টাকা ফিরে পাবেন তা ভাবতেই পারেননি লন্ডন প্রবাসী শামীম আহমেদ চৌধুরী। তার ভাষায়- ‘একটি গরিব দেশ হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশ। অনেক উন্নত দেশেও এতো টাকা ফিরে পাওয়া কঠিন। কিন্তু বাংলাদেশের একজন নাগরিক টাকা পেয়ে তা ফিরিয়ে দিয়েছেন। এই বিরল দৃষ্টান্তের জন্য স্বদেশ নিয়ে আমার গর্ব আরো বেড়ে গেলো। এই দেশেও অনেক সৎ লোক রয়েছেন।’ এই দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী সৎ মানুষের নাম আশরাফ আল কাদের হ্যাপি। তিনি বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একজন জুনিয়র পার্সার। ঘটনাটি ঘটে গত ১৪ই ডিসেম্বর বাংলাদেশ বিমানের বিজি-০০২ ফ্লাইটে। হিথ্রো বিমানবন্দর থেকে বিমানটি যখন আকাশে উড়ার জন্য সমপূর্ণ প্রস্তুতি নিয়েছে তখনই একজন মহিলা যাত্রী হ্যাপির দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। ময়লা সদৃশ মোড়ানো কালো পলিথিন তুলে দিয়ে তা ডাস্টবিনে ফেলে দিতে অনুরোধ করেন হ্যাপিকে। ছোট ওই পলিথিনের প্যাকেট হাতে করে যাত্রীদের সামনে দিয়ে নিয়ে যাওয়া দৃষ্টিকটু হবে। তাই ইউনিফরমের ওপরে থাকা জ্যাকেটের পকেটে রেখে দেন পরে ফেলে দিবেন ভেবে। কিন্তু কাজের চাপে তা ফেলতে ভুলে যান তিনি। ঘটনার শুরুটা এভাবেই। দূর দেশ থেকে বিমানটি সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হয়ে ঢাকায় ফিরে। তখন ১৫ই ডিসেম্বর দুপুর দেড়টা। বিমান বন্দর থেকে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাসায় ফিরে ফ্রেশ হচ্ছিলেন হ্যাপি। ওই সময়ে মনে পড়ে কালো পলিথিনের ময়লা সদৃশ্য প্যাকেটটির কথা। তা ডাস্টবিনে ফেলার জন্য মেয়ে প্রিয়দর্শিনীকে ডাকেন। ডাকতে ডাকতেই হাতে নেন। আগে অনুভব করেননি। এবার অনুভূত হলো প্যাকেটটি তুলনামূলক ভারী। শুধু কাগজ বা পলিথিন হলে এ রকম মনে হতো না। কৌতূহল নিয়েই প্যাকেটটি খোলেন। পলিথিনের ভেতরে একটি খাকি খাম। বিস্ময়ে চোখ দু’টি আটকে যায়। খামের ভেতরে পাউন্ড। অনেক পাউন্ড। সঙ্গে ব্যবহৃত টিস্যু পেপার। দু’টি ভাঁজে রাখা পাউন্ডগুলো গুনতে থাকেন। সর্বমোট ৩ হাজার ২শ’ ৮৫ পাউন্ড।

বাংলাদেশ বিমানের কেবিন ক্রু  কাজী মো. আশরাফ আল কাদের,যিনি টাকা পাওয়ার পরে অনেক কস্টে নিজেঢ় উদ্যোগে মালিককে খুঁজে বের করে প্রায় ৩ লক্ষ ২৫ হাজার টাকা ফেরত দিয়েছেন

বাংলাদেশ বিমানের কেবিন ক্রু কাজী মো. আশরাফ আল কাদের,যিনি টাকা পাওয়ার পরে অনেক কস্টে নিজেঢ় উদ্যোগে মালিককে খুঁজে বের করে প্রায় ৩ লক্ষ ২৫ হাজার টাকা ফেরত দিয়েছেন

কেবিন ক্রু হ্যাপি জানান, পাউন্ড পেয়ে দুশ্চিন্তায় পড়ে যান তিনি। এতো টাকা কি করবেন। এর মালিককে কিভাবে খুঁজে পাবেন। তিনি বলেন, ‘পাউন্ডের মালিকের ভাগ্য ভালো যে ওই পলিথিনে টুকরো কাগজে ‘নিজ’ লেখা লন্ডনের একটি ফোন নম্বর ছিল।’ ওই নম্বরে কল দিতেই এক ভদ্রলোক তা রিসিভ করেন। হ্যাপি তার কাছে জানতে চান, এই দুই-এক দিনের মধ্যে আপনার পরিচিত কেউ বাংলাদেশ বিমানে লন্ডনে বা লন্ডন থেকে বাংলাদেশে এসেছেন কি-না। ফোনের অপরপ্রান্তের ব্যক্তির কণ্ঠে বিস্ময়। তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ আমি বাংলাদেশ থেকে লন্ডনে এসেছি।’ তারপরই জানতে চান, ‘আপনার কিছু হারিয়েছি কি-না।’ ওই ব্যক্তি জানান, তার প্রায় ৪ হাজার পাউন্ড হারিয়েছে। তা পলিথিনে মোড়ানো একটি খামে ছিল।
পাউন্ডের অঙ্ক না মেলায় সঠিকভাবে হিসাব করে পাউন্ডের অঙ্ক জানাতে অনুরোধ করেন হ্যাপি। পরবর্তীতে ফোনে ওই ব্যক্তি জানান, সেখানে ৪ হাজার পাউন্ড ছিল। কিছু খরচ করার পর ৩ হাজার ২ শতাধিক পাউন্ড ছিল। এরমধ্যে আলাদা একটি ভাঁজে তিনটি ২০ পাউন্ড করে ৬০ পাউন্ড ছিল। এতে টিস্যু পেপার ও একটি সাদা কাগজে বাংলায় লেখা তার ফোন নম্বরটি রয়েছে। তারপরই হ্যাপি নিশ্চিত হন এই পাউন্ডের মালিক ওই ব্যক্তি। তিনি লন্ডন প্রবাসী শামীম আহমেদ চৌধুরী। কথাবর্তার একপর্যায়ে তার পাউন্ডগুলো নিতে অনুরোধ করেন হ্যাপি। তখনও শামীম বিশ্বাস করতে পারেননি হারানো পাউন্ডগুলো ফিরে পাচ্ছেন। শামীম জানান, ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে ঢাকায় আসবেন তিনি। তখনই তা ফেরত নিবেন। ২৯শে ডিসেম্বর দেশে ফিরেন শামীম। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে হ্যাপির মোহাম্মদপুরের বাসায় যান তিনি। ‘দেশে এখনও অনেক ভালো মানুষ আছেন’ বলতে বলতেই হ্যাপিকে জড়িয়ে ধরেন প্রবাসী শামীম আহমেদ চৌধুরী। শামীম বলেন, ‘আমার কাছে স্বপ্নের মতোই লাগছে।’ পরে পাউন্ডগুলো বুঝে নেন তিনি। এ বিষয়ে শামীম আহমেদ চৌধুরী সাংবাদিকদের জানান জানান, যে ফ্লাইটে ব্যাগটি পাওয়া গেছে ওই বিমানের তার আগের ফ্লাইটে লন্ডনে যান তিনি। হ্যান্ড ব্যাগে পলিথিনের ভেতরে একটি খামে ছিল ওই পাউন্ডগুলো। পলিথিনের ব্যাগটি বের করে সেখান থেকে ৩৫ পাউন্ড দিয়ে বিমানে সিগারেট কিনেছিলেন। তারপর পলিথিনের ব্যাগটি হ্যান্ড ব্যাগে রাখতে ভুলে যান। তা সিটের মধ্যেই ছিল। শামীম বলেন, ‘পাউন্ডগুলো হারিয়ে এর আশা ছেড়ে দিয়েছিলাম। কেবিন ক্রু হ্যাপি সততার পরিচয় দিয়ে আমাকে ঋণী করেছেন। এ রকম সৎ মানুষ অনেক উন্নত দেশেও পাওয়া দুষ্কর’ বলে জানান তিনি। লন্ডন প্রবাসী শামীম আহমেদ চৌধুরী হবিগঞ্জের নবীগঞ্জের আউশকান্দির মিঠাপুরের বাসিন্দা। ফেসবুকের নিজের প্রোফাইলে তিনি আরো বলেন,বিমানের যে ভদ্রমহিলা পাউন্ডের প্যাকেটটা সততার সহিত ভাইয়ের হাতে তুলে দিয়েছিলেন বিশেষ ভাবে তার প্রতি আমি কৃতজ্ঞতা জানাইতেছি। আল্লাহ্ তিনিকে ভাল রাখুন। সুস্হ রাখুন, যদি কেউ তার ফোন নাম্বার পাঠান তাহলে কৃতগ্গ হব। যদি তিনি আমার পোস্ট পড়ে থাকেন , দয়া করে আমাকে নাম্বার টা দিবেন। আমি কল করে তাকে কৃতজ্ঞতা জানাতে চাই।
লন্ডন প্রবাসী শামীম আহমেদ চৌধুরী যিনি যুক্তরাজ্যে যাবার কালে ৩২২০ পাউন্ড, বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমান প্রায়  ৩ লক্ষ ২৫ হাজার টাকা  নিজের অজান্তে   টাকা হারিয়েছিলেন। টাকা ফেরত পাওয়ার পরে তিনি ফেসবুকে এই পোস্ট লিখেন

লন্ডন প্রবাসী শামীম আহমেদ চৌধুরী যিনি যুক্তরাজ্যে যাবার কালে ৩২২০ পাউন্ড, বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমান প্রায় ৩ লক্ষ ২৫ হাজার টাকা নিজের অজান্তে টাকা হারিয়েছিলেন। টাকা ফেরত পাওয়ার পরে তিনি ফেসবুকে এই পোস্ট লিখেন

কেবিন ক্রু হ্যাপির পুরো নাম কাজী মো. আশরাফ আল কাদের। মোহাম্মদপুরের নূরজাহান সড়কের ভি-২০ বাড়ির বাসিন্দা হ্যাপি। প্রয়াত কাজী নুরুল কাদের ও রাশেদা কাদেরের ছেলে তিনি। বরেণ্য সাংবাদিক প্রয়াত এবিএম মূসার ভাগ্নে হ্যাপি। হ্যাপি জানান, বোধোদয়ের পর থেকেই মায়ের কাছ থেকে ধর্মীয় এবং নৈতিকতার শিক্ষা পেয়েছেন। ধর্মভিরুতার কারণেই পাউন্ড ওই ব্যাগে দেখার পর মনে হয়েছে এই পাউন্ড ফিরিয়ে দেয়া তার নৈতিক দায়িত্ব। তা খরচ করার কোনো অধিকার তার নেই। তা খেয়ানত করা হলে আল্লাহ্‌র কাছে জবাব দিতে হবে। এই মানসিকতা থেকেই মালিককে খোঁজার চেষ্টা করেন তিনি। পাউন্ডগুলো ফিরিয়ে দিয়ে অনেক স্বস্তি পাচ্ছেন বলে জানান হ্যাপি। হ্যাপিকে নিয়ে গর্বিত বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষ। এ বিষয়ে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের জিএম (পাবলিক রিলেশন্স) শাকিল মেরাজ সাংবাদিকদের বলেন, ‘এই ঘটনায় দেশের মানুষের প্রতি প্রবাসী আস্থা-বিশ্বাস দৃঢ় হবে। একইভাবে বাংলাদেশ বিমানের কর্মরতদের প্রতি আস্থা বৃদ্ধি পাবে। এজন্য হ্যাপি প্রশংসার দাবিদার। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স তাকে নিয়ে গর্বিত’ বলে জানান তিনি।

ভিডিও দেখতে এখানে ক্লিক করুন
ভিডিও-১ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
ভিডিও-২ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
ভিডিও-৩ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
ভিডিও-৪ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
ভিডিও-৪ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
ভিডিও-৫ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
আরো বিস্তারিত জানতে হাবিবুল্লাহ মিজান

Print Friendly

উপদেষ্টা সম্পাদক : আরিফ নেওয়াজ ফরাজী বাদল

সম্পাদক : হাবিবুল্লাহ মিজান

মোবাইল : ০১৫৩৪৬০৪৪৭৬, ই-মেইল : mizandeshi@gmail.com