Home / সম্পাদকের নির্বাচিত / রাজনীতি তো এখন ব্যবসা হয়ে গেছে !?

রাজনীতি তো এখন ব্যবসা হয়ে গেছে !?

অল ক্রাইমস টিভিঃ আওয়ামী লীগনৌকা মার্কা পেলেই বিজয় নিশ্চিত। আর এই নিশ্চিত বিজয় অর্জনের জন্য যত টাকাই লাগুক, খরচ করতে হবে। এটাই এবারের ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে সরকারি দল আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রার্থীদের মনোভাব। এ জন্য মনোনয়ন পেতে প্রার্থীরা লাখ লাখ টাকা খরচ করেছেন। আর যেকোনো মূল্যে জয়ী হতে হবে—এই ভাবনা থেকেই প্রাণহানি, দলীয় কার্যালয় ভাঙচুর, রাস্তা অবরোধ, বহিষ্কার–পাল্টা বহিষ্কারের মতো ঘটনা ঘটছে।
আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল ও নির্বাচন সমন্বয়ে সংশ্লিষ্ট অন্তত সাতজন এবং তৃণমূলের ১০ জন প্রার্থীর সঙ্গে কথা বলে এমন মনোভাব জানা গেছে।
ইতিমধ্যে চার ধাপের প্রায় ২ হাজার ৬০০ ইউপি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ৬৮ জনের প্রাণ গেছে। আহত হয়েছেন কয়েক হাজার মানুষ। সংঘাত-সহিংসতায় যুক্ত এবং প্রাণহানির শিকার ব্যক্তিদের বেশির ভাগই সরকারি দলের নেতা-কর্মী-সমর্থক। পঞ্চম ও ষষ্ঠ ধাপে আরও ১ হাজার ৩৯৩টি ইউপিতে ভোট হবে ২৮ মে ও ৪ জুন।
শুধু চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী নয়, মনোনয়ন–বাণিজ্য হয়েছে সদস্য পদেও। দল মনোনীত চেয়ারম্যান প্রার্থীদের প্যানেলে থাকতে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা গুনতে হয়েছে সদস্য প্রার্থীদের। যশোর জেলার সদ্য নির্বাচিত একজন ইউনিয়ন চেয়ারম্যান বলেন, ‘এখন আগের মতো অবস্থা নেই। নির্বাচন করতে এখন খুব বেশি টাকা লাগে না। তবে মনোনয়ন কিনতে টাকা লাগে।’ আপনি কীভাবে টাকা জোগাড় করেছেন, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমার প্যানেলে আসতে মেম্বারদের এক লাখ টাকা করে দিতে হয়েছে। এতে টাকা জোগাড় হয়ে গেছে।’
আওয়ামী লীগের ইউপি নির্বাচন তদারক করছেন দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের নেতৃত্বে একদল কেন্দ্রীয় নেতা। তৃতীয় পর্বের ভোটের পর ওবায়দুল কাদের স্বীকার করেছিলেন, মনোনয়ন–বাণিজ্যের অভিযোগ আসছে। দলীয় সূত্র জানায়, এগুলো যাচাই-বাছাই করার জন্য মৌখিকভাবে কেন্দ্রীয় কয়েকজন নেতাকেও দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে দলের নেতারা এটাকে ‘লোক দেখানো’ হিসেবেই মনে করছেন।
গতকাল জানতে চাইলে ওবায়দুল কাদের মনোনয়ন–বাণিজ্যের বিষয়ে বলেন, ‘অভিযোগ আছে, পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখছি। তবে এটা নিয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো কমিটি হয়নি। কেন্দ্রীয় নেতারাই খতিয়ে দেখছেন।’ অভিযোগ পাওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘২৫-৩০টি অভিযোগ খুব সিরিয়াসলি দেখছি। জিনিসগুলো এত সূক্ষ্ম যে প্রমাণ করা কঠিন।’
আওয়ামী লীগের তৃণমূল পর্যায়ের ১০ জন নেতা দাবি করেন, তৃণমূলে মনোনয়ন দেওয়ার সঙ্গে জড়িত নেতাদের মূল লক্ষ্য ছিল বিত্তশালীরা। তাঁরা একক প্রার্থী দিতে না পারলে কোনো রকম তালিকায় নিজের পছন্দের প্রার্থীর নাম পাঠিয়ে কেন্দ্রে এসে শুরু করেন তদবির। মনোনয়ন পাওয়া মুন্সিগঞ্জের সদর এলাকার এক প্রার্থী বলেন, তৃণমূলের আশায় বসে থাকলে চলে না। এ জন্য তিনি কেন্দ্রেও ৪০ লাখ টাকা খরচ করেছেন।
গত ২০ এপ্রিল কুমিল্লা উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম সরকারের বিরুদ্ধে ২২টি ইউপির চেয়ারম্যান পদে দলীয় মনোনয়ন পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাসে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে পাঁচ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ তোলেন স্থানীয় নেতারা। মুরাদনগর উপজেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতা ও সম্ভাব্য পাঁচজন প্রার্থী সংবাদ সম্মেলন করেন। তাঁদের মধ্যে দুজন বর্তমান চেয়ারম্যান।
লিখিত বক্তব্যে উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ও বাঙ্গুরা (পূর্ব) ইউপির বর্তমান চেয়ারম্যান আবদুল হাকিম অভিযোগ করে বলেন, ‘উপজেলার প্রতিটি ইউনিয়নে দু-তিনজন চেয়ারম্যান প্রার্থীকে মনোনয়ন দেওয়ার মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে জাহাঙ্গীর আলম পাঁচ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। মনোনয়ন না পেয়ে জাহাঙ্গীর আলমের ঢাকার রমনার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও ঢাকার বাসায় হাজির হই। টাকা ফেরত চাওয়ায় উল্টো আমাদের হুমকি দেওয়া হয়।’ সংবাদ সম্মেলনের পর তাঁরা দলের নেতা-কর্মীদের নিয়ে উপজেলা পরিষদের সামনের সড়কে টাকা ফেরত পাওয়ার দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধন করেন।
জানতে চাইলে জাহাঙ্গীর আলম প্রতিবেদককে বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ ভিত্তিহীন। যারা অভিযোগ করছে, তাদের সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। আর আমি পারিবারিকভাবেই ধনী, সৎভাবে জীবনযাপন করি।’
তিন স্তরে বাণিজ্য: আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, মনোনয়ন নিয়ে তিন স্তরে বাণিজ্য হয়েছে। প্রাথমিকভাবে সম্ভাব্য প্রার্থীরা ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা সভাপতি-সাধারণ সম্পাদককে খুশি করেন। কারণ, তৃণমূলের ছয়জনের সই করা প্রার্থী তালিকা কেন্দ্রে পাঠানোর নিয়ম। ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন, এই স্তরে এলাকা ও ব্যক্তিভেদে ৬ থেকে ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ করতে হয়েছে। এর পরের স্তরে স্থানীয় সাংসদ ও কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্যদের খুশি করতে হয়েছে। দুজন সাংসদ বলেন, অনেক জেলায় সাংসদেরা দলের উপজেলা বা জেলা স্তরের নেতৃত্বে আছেন। সেখানে তাঁরাই সর্বেসর্বা।
এর বাইরে আরেকটা বাণিজ্য হয়েছে ‘সুষ্ঠু ভোট’ করে দেওয়ার নাম করে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার আওয়ামী লীগের এক বিদ্রোহী প্রার্থী, যিনি ২২ মার্চ অনুষ্ঠিত প্রথম পর্বের ভোটে জয়ী হন। তিনি বলেন, মনোনয়ন পাওয়ার জন্য প্রথমে দলের নেতাদের পেছনে ২০ লাখ টাকা খরচ করেন তিনি। স্থানীয় সাংসদের সমর্থন না পাওয়ায় কেন্দ্রীয় মনোনয়ন বোর্ডে তাঁর নাম যায়নি। পরে বিদ্রোহী হিসেবে দাঁড়িয়ে সাংসদের আশীর্বাদ চাইতে গিয়ে ১০ লাখ টাকায় সুষ্ঠু ভোটের আশ্বাস আদায় করেন।
নারায়ণগঞ্জের কুতুবপুরে ঘটেছে আরেকটি চমকপ্রদ ঘটনা। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী ভোট পেয়েছেন ৪২ হাজার। আর আওয়ামী লীগের প্রার্থীর ভোট ১১ হাজারেরও কম। বিরুদ্ধ স্রোতের মধ্যেও এমন ফল করার জন্য বিএনপির প্রার্থী স্থানীয় সাংসদের আনুকূল্য পাওয়ার কথা আলোচনায় আছে। এখানে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ছিলেন গোলাম রসুল। তিনি বলেন, ‘সারা দেশে নৌকা ভালো করেছে। এখানে জনগণ হয়তো মনে করেছে আমাকে দিয়ে ভালো হবে না, এ জন্য ভোট দেয়নি। আমি ১৯৯৮ সালে এই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ছিলাম।’
দলের কেন্দ্রীয় সম্পাদকমণ্ডলীর আরেকজন সদস্য বলেন, প্রার্থী হওয়ার পর কেন্দ্রীয় কোনো কোনো নেতা নানা কৌশলে টাকা খাচ্ছেন। প্রতি পর্বেই দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার পর অনেক প্রার্থীর বিরুদ্ধে বিএনপি-জামায়াতের রাজনীতি–সংশ্লিষ্ট বা রাজাকার পরিবারের সন্তান বলে সমালোচনা শুরু হয়। কোনো কোনো নেতা সমালোচনা ঠেকানোর নাম করে টাকা নিয়েছেন।
মনোনয়নে যত বাণিজ্য: ৭ মে লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ উপজেলার দরবেশপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ইমান হোসেন মনোনয়ন–বাণিজ্যের অভিযোগসংবলিত একটি লিখিত আবেদন করেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের কাছে। তিনি বলেন, ষষ্ঠ ধাপে অনুষ্ঠেয় ভোটের জন্য দরবেশপুর ইউনিয়নের একজন চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী হিসেবে স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতারা সর্বসম্মতভাবে বর্ধিত সভার মধ্য দিয়ে তাঁর নাম চূড়ান্ত করেন। কিন্তু পরে টাকার বিনিময়ে দলীয় মনোনয়ন পান বিএনপি ঘরানার বলে পরিচিত মিজানুর রহমান।
নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলায় ২৩ ইউনিয়নের মধ্যে ১৬টিতে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী ছিলেন। দলটির স্থানীয় নেতারা অভিযোগ করেন, স্থানীয় সাংসদ রাজিউদ্দিন আহমেদ টাকা নিয়ে মনোনয়ন দেওয়ায় বিদ্রোহীর সংখ্যা এত বেশি হয়েছে। অভিযোগ আছে, ৭ মের চতুর্থ ধাপের নির্বাচনের দিন তিনি ভৈরবে অবস্থান করে বিদ্রোহী প্রার্থীদের হুমকি–ধমকি দেন। অন্য জেলায় ঘটনাস্থল হওয়ায় নির্বাচন কমিশন তাঁর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেনি। রাজিউদ্দিন আহমেদের চাপ থাকা সত্ত্বেও চারজন বিদ্রোহী প্রার্থী জয়ী হন।
জানতে চাইলে রাজিউদ্দিন আহমেদ প্রতিবেদককে বলেন, ‘রায়পুরায় এ ধরনের সংস্কৃতি নেই। এটা কোনো দিনই হয়নি, কোনো দিনই হবে না।’ নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন না হওয়ার জন্য নির্বাচন কমিশনের অনুমতি নিয়েই তিনি ভোটের দিন ভৈরবে অবস্থান করেন বলে দাবি করেন।
কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার তিন ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে তৃণমূলের ভোটে বাছাই করা তিন প্রার্থীর নাম কেন্দ্রে না পাঠিয়ে টাকার বিনিময়ে অন্যদের নাম পাঠানো হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
দলদলিয়া ইউপিতে তৃণমূলের ভোটে বাছাই হওয়া জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের ডেপুটি কমান্ডার মুক্তিযোদ্ধা আমিনুল ইসলাম, ধামশ্রেণী ইউপির রাকিবুল হাসান সরদার এবং তবকপুর ইউপিতে সাবেক চেয়ারম্যান ওয়াদুদ হোসেন মুকুল গত ২৮ এপ্রিল উলিপুর প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে এ অভিযোগ করেন।
যশোরের কেশবপুরে মনোনয়ন না পাওয়া একজন নেতা গত ২২ এপ্রিল সংবাদ সম্মেলন করে অভিযোগ করেন, টাকা খেয়ে উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এস এম রুহুল আমিন তাঁকে মনোনয়ন থেকে বঞ্চিত করেছেন।
গত ২১ এপ্রিল মনোনয়ন–বাণিজ্য বন্ধের দাবি জানিয়ে ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর রাজনৈতিক কার্যালয়ের সামনে মানববন্ধন করেন আওয়ামী লীগের চট্টগ্রাম অঞ্চলের একদল তৃণমূল নেতা-কর্মী। তাঁরা অভিযোগ করেন, ‘টাকার বিনিময়ে জামায়াত-সমর্থিতদের’ চেয়ারম্যান পদে মনোনয়নের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে। তাঁরা বলেন, তাঁদের কেউ কেউ তৃণমূলে সর্বোচ্চ ভোট পেলেও প্রার্থিতা থেকে বাদ দেওয়ার চক্রান্ত চলছে। তাঁরা বাণিজ্য বন্ধে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেন। এসব ইউপির ভোট ২৮ মে।
জয়পুরহাটের কালাইয়ের দুটি ইউপিতে রাজাকার পরিবারের সদস্যদের আওয়ামী লীগের মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করে প্রধানমন্ত্রী বরাবর গত ৮ এপ্রিল স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতারা চিঠি দেন। এর আগে তাঁরা ফেব্রুয়ারিতে এ বিষয়টি নিয়ে জয়পুরহাটে সংবাদ সম্মেলন করেন। তাঁদের অভিযোগ, আওয়ামী লীগের একজন কেন্দ্রীয় নেতা, যিনি ওই জেলার সন্তান, তিনিই রাজাকারের ছেলেকে নৌকা দিয়েছেন।
মনোনয়ন–বাণিজ্যের বিষয়ে জানতে চাইলে স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ তোফায়েল আহমেদ বলেন, সুষ্ঠু রাজনীতি না থাকলে এটা হবেই। রাজনীতি তো এখন ব্যবসা হয়ে গেছে। অর্থবিত্তওয়ালাদেরও রাজনীতিতে আসার খায়েশ বেড়েছে। আর গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে প্রার্থী নির্বাচন না হলে তো মনোনয়ন–বাণিজ্য হবেই।

Print Friendly

উপদেষ্টা সম্পাদক : আরিফ নেওয়াজ ফরাজী বাদল

সম্পাদক : হাবিবুল্লাহ মিজান

মোবাইল : ০১৫৩৪৬০৪৪৭৬, ই-মেইল : mizandeshi@gmail.com