এই মুহুর্তে পাওয়া..
Home / শীর্ষ অপরাধ / খুনি নূর হোসেন ‘আউট’, খুনি গিয়াস উদ্দিন ‘ইন’

খুনি নূর হোসেন ‘আউট’, খুনি গিয়াস উদ্দিন ‘ইন’

killers
হাবিবুল্লাহ মিজান,অল ক্রাইমস টিভিঃ নারায়ণগঞ্জের কাউন্সিলর নজরুলসহ বহুল আলোচিত সাত খুনের প্রধান আসামী নূর হোসেন বর্তমানে পলাতক। এলাকা ছাড়া তার সহযোগীরাও। ফলে নূর হোসেনের অপরাধের সাম্রাজ্য এখন প্রায় অভিভাবকহীন। আর এই সুযোগে ধীরে ধীরে পুরানো চেহারায় আর্ভিভূত হচ্ছেন বিএনপি দলীয় সাবেক সংসদ সদস্য গিয়াস উদ্দিন ও তার বাহিনী।
নারায়নগঞ্জ তথা দেশবাসীর দৃষ্টি যখন এই খুন ও খুনিদের উপর, ঠিক তখন কৌশলে নূর হোসেনের সাম্রাজ্যে নিজের আধিপত্য বিস্তারে নতুন করে হানা দিচ্ছেন নূর হোসেনের গুরু, সুবিধাভোগী রাজনীতিবিদ খ্যাত গিয়াস উদ্দিন। অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে গিয়াস উদ্দিনের নতুন করে আধিপত্য বিস্তারের যতসব চাঞ্চল্যকর তথ্য।
নূর হোসেনের অবৈধ বালু মহাল উচ্ছেদের পরদিন সকাল থেকেই গিয়াস উদ্দিনের অনুসারী, সিদ্দিরগঞ্জ থানা বিএনপি নেতা ইকবালের সন্ত্রাসী বাহিনী পুনরায় বালু মহালগুলো দখল করে নিয়েছে।
এর দু’দিন পর গিয়াস উদ্দিনের ঘনিষ্ট সহযোগী, আদমজী ইপিজেডের একচ্ছত্র অধিপতি শীর্ষ সন্ত্রাসী আকরাম, মহানগর ছাত্রদলের আহব্বায়ক মনিরুল ইসলাম সবুজ, যুগ্ম আহব্বায়ক ফতেহ রেজা রিপন এবং থানা যুবদলের সভাপতি মমতাজ উদ্দিন মন্তু’র মাধ্যমে নূর হোসেনের মালিকানাধীন এবিএস পরিবহনের ৪৫টি যাত্রীবাহী বাস, কাউন্টারসহ নাম পরিবর্তন করে দখল করে নেয়। সিদ্ধিরগঞ্জ, শিমরাইল, কাঁচপুর, চিটাগাং রোড, সিদ্ধিরগঞ্জপুল, আদমজী, ফতুল্লা বিসিকসহ বিভিন্ন এলাকায় পুনরায় জমি দখল, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসাসহ সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে সে। উল্লেখ্য, আদমজী ইপিজেড এর জুট ব্যবসারও একক নিয়ন্ত্রন হাতে নিয়েছেন আকরাম।
গিয়াস উদ্দিনের আরেক সহযোগী ও ভাগ্নে, ভুইঘর এলাকার মাসুদ মেম্বার ইতোমধ্যে সাধারণ মানুষের জায়গা দখল করা শুরু করেছেন। তবে প্রাণের ভয়ে এব্যাপরে কেউ প্রতিবাদ করতে পারছেন না। সন্ত্রাসী কার্যকলাপ ও ভূমি দখলের পাশাপাশি নানা অবৈধ কর্মকান্ডের মাধ্যমে এখন সে শিমরাইল, ভূইঘর, সাইনবোর্ড, চিটাগাং রোড, আটি, মক্কিনগর এলাকার ত্রাস। তার বর্তমান বাড়িটিও দখল করে নেয়া। এলাকাবাসীরা জানান, ২০০৪ সালে আটি অঞ্চলে মহি উদ্দিন মিজির ৩২ শতাংশ পৈত্রিক সম্পত্তি দখল করে নেয় সে।
গিয়াস উদ্দিনের আরেক আস্থাভাজন সহযোগী কালা মানিক। হত্যা, ধর্ষণ, জমি দখল, মাদক বিক্রিসহ একাধিক ডাকাতি মামলার পলাতক আসামি এই কালা মানিক। তাকে সহায়তা করে থাকে গোদনাইল এলাকার আরেক ত্রাস যুবদল নেতা বোরহান এবং ফরিদ।
ফতুল্লা বিসিক এলাকার নিয়ন্ত্রণ করছে গিয়াস উদ্দিনের ঘনিষ্ট ও পুলিশের খাতায় তালিকাভূক্ত সন্ত্রাসী, স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা রিয়াদ মুহাম্মদ চৌধুরী, পিস্তল মিঠু ও গলাচিপার বন্দুক শাহীন। এরা যুবলীগ নেতা মঞ্জুরুল ইসলাম মঞ্জু হত্যার এজহারভূক্ত আসামি। বিসিকে চোরাই তেল ঘাট, সারঘাট, মাছঘাট, গরুর হাট ও ফতুল্লা ডিআইটি মাঠ তাদের নিয়ন্ত্রণে।
বন্দর, মদনপুরসহ উত্তরাঞ্চলের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে ঠান্ডা মাথার খুনি খ্যাত মদনপুরের ত্রাস বিএনপি নেতা কাবিল হোসেন ওরফে কাবিলা ও আমান উল্লা ওরফে আমান। পদ্মা সিটি, পূর্বাচল ন্যাচারাল সিটি সহ এই এলাকা নিয়ন্ত্রন করে তারা। অভিযোগ আছে যারাই তাদের অপকর্মের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন তাদেরকে সামাজিক ভাবে হয়রানি করা হয়েছে। কোন কোন ক্ষেত্রে খুন পর্যন্ত হতে হয়েছে বলে দাবি স্থানীয়দের।
সাত খুনের আসামি পলাতক নূর হোসেন ছিল বর্তমানে নারায়নগঞ্জের অঘোষিত ডন গিয়াস উদ্দিনের আবিস্কার। এমনকি নুর হোসেনের সেকেন্ড ইন কমান্ড বন্দরের ত্রাস কিলার সেলিম এর উত্থানও গিয়াস উদ্দিনের হাত ধরেই। গিয়াস উদ্দিনের সাম্রাজ্যের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে আরও একজন ভয়ংকর সন্ত্রাসী। সিদ্দিরগঞ্জ থানা বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি আব্দুল হাই রাজু। এছাড়া নারায়ণগঞ্জের প্রায় অর্ধশতাধিক শীর্ষ সন্ত্রাসীর জন্মদাতা এই গিয়াস উদ্দিন, যাদের প্রত্যেকেই চাাঁদাবাজি, ডাকাতি, ধর্ষণ, খুন ও গুমসহ ডজন ডজন মামলার আসামি।
গিয়াস উদ্দিনের উত্থান যেভাবে: ৮০’র দশকে রাজনীতিতে আসেন গিয়াস উদ্দিন। শুরুতে ছিলেন আওয়ামীলীগের একজন কর্মী মাত্র। মেধা ও যোগ্যতায় অল্প সময়েই রাজনীতিতে সবার পরিচিত মুখ হয়ে উঠেন তিনি। রাতারাতি তিনি কৃষকলীগের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি হয়ে যান। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ১৯৯৬ সালে আওয়ামীলীগের সমর্থিত প্রার্থী হিসাবে সদর উপজেলার নির্বাচন করেন এবং বিপুল ভোটে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এর পর থেকেই তিনি গড়ে তুলতে থাকেন তার অবৈধ ত্রাসের সা¤্রাজ্য। পাশাপাশি গড়ে তোলেন সন্ত্রাসী বাহিনী। চেয়ারম্যানের ব্যানারে শুরু করেন জমি দখল, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, নারী ও শিশু পাচার সহ নানা অপকর্ম।
২০০১ সালের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের আগ মূহুর্তে সুবিধাভোগী এই রাজনীতিবিদ বিএনপিতে যোগ দেন। ৮ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি নেতা সফর আলী ভূঁইয়াকে পেছনে ফেলে বিএনপির ব্যানারে নির্বাচন করে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এমপি নির্বাচিত হওয়ার পর গিয়াস উদ্দিন হয়ে উঠেন নারায়ণগঞ্জের অঘোষিত ডন।
এমপি গিয়াসের যত অবৈধ কাজ: এমপি হওয়ার পর বেপরোয়া হয়ে উঠেন গিয়াস উদ্দিন। তার বাহিনী গড়ে তুলে এলাকায় একচ্ছত্র আধিপত্য। তার ইশারায় প্রতিনিয়ত হতে থাকে খুন, গুম, জবর-দখল, চাদাবাজি, মাদক ব্যবসাসহ সন্ত্রাসী কর্মকান্ড। এমপি থাকাকালীন সময়ে অনিয়ম দূর্নীতির জন্য প্রায়ই হতেন খবরের শিরোনাম। তবে প্রাশাসনের সাথে ভাল সম্পর্ক থাকায় তার বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি কখনও।
বর্তমান জেলা বিএনপির সভাপতি এ্যাড. তৈমূর আলম খন্দকারের ছোট ভাই বিকেএমইএর সাবেক সহ-সভাপতি সাব্বির আলম খন্দকার, গিয়াস উদ্দিনের অপকর্মের বিরুদ্ধে জনসম্মুখে প্রতিবাদ করায় পরের দিন মাসদাইরস্ত নিজ বাড়ির সামনে নৃশংসভাবে খুন হন । গিয়াস উদ্দিনের ইশারায় একের পর এক খুন হন ইট ভাটার মালিক মোজাফ্ফর, সানার পাড় বাজারের ব্যবসায়ী হাজী কফিল উদ্দিন, চুন ব্যবসায়ী চাঁন মিয়া, বন্দর থানা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক আশরাফুল হক আশা। এসব হত্যাকান্ডর ব্যাপারে বাদী পক্ষের লিখিত অভিযোগে গিয়াস উদ্দিনকে মদদ দাতা হিসাবে অভিযুক্ত করা হয়। তবে তৎকালীন বিএনপি প্রভাবশালী মন্ত্রী প্রয়াত আব্দুল মতিন চৌধুরীর আস্থাভাজন হওয়ায় থেকে যান ধরা ছোঁয়ার বাইরে।
সাব্বির হত্যা মামলায় গিয়াস উদ্দিনকে প্রধান আসামী করে ফতুল্লা থানায় ৩০২/৩৪ ধারায় মামলা (নং ২৮(২)০৩) দায়ের করেন অ্যাডভোকেট তৈমুর আলম খন্দকার। মামলার তদন্তে পুলিশ গিয়াস উদ্দিনকে অভিযুক্ত করে তদন্ত প্রতিবেদনও জমা দেয়। পরবর্তিতে মামলা চলে যায় সিআইডিতে। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে সিআইডির প্রতিবেদন থেকে নাম প্রত্যাহার করেন তিনি। পরে গিয়াসের একান্ত সহযোগী, আলোচিত সন্ত্রাসী পলাতক জাকির খাঁনকে প্রধান আসামি করা হয়।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে সব অস্বীকার করে সাবেক এমপি গিয়াস উদ্দিন কে বলেন, আমার কোনো বাহিনী ছিল না, এখনও নেই। আমার ঘনিষ্ঠ কেউ দখল, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসে জড়িতও নয়। কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে এবং তা প্রমাণ হলে প্রশাসন নিশ্চয়ই ব্যবস্থা নেবে। আর আমার মালিকানাধীন জমি আবার আমার দখলে নেয়ার কী আছে!
নূর হোসেন প্রসঙ্গে জানতে চাইলে গিয়াস উদ্দিন বলেন, সিদ্ধিরগঞ্জে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল নূর হোসেন। তার বাহিনীর হাতে জিম্মি ছিল ব্যবসায়ীসহ সাধারণ মানুষ। সে আমার কাছেও এক কোটি টাকা চাঁদা চেয়েছিল। আমি না দেয়ায় নির্মাণাধীন মার্কেটের কাজ এক বছর ধরে বন্ধ রেখেছিল।

Print Friendly

উপদেষ্টা সম্পাদক : আরিফ নেওয়াজ ফরাজী বাদল

সম্পাদক : হাবিবুল্লাহ মিজান

মোবাইল : ০১৫৩৪৬০৪৪৭৬, ই-মেইল : mizandeshi@gmail.com