এই মুহুর্তে পাওয়া..
Home / সম্পাদকের নির্বাচিত / অপরাধ না করার শাস্তি !?

অপরাধ না করার শাস্তি !?

অল ক্রাইমস টিভিঃ জোর যার মুল্লুক তার। কিন্তু কিসের জোর? কোন জোরে শত শত মানুষের সামনে শ্রেণিকক্ষের দরজা লাগিয়ে রেখে একটি মেয়েকে বিবস্ত্র করে তার ভিডিও তোলা যায়? তারপর তাকে পেটানো যায়? তারপর বীরদর্পে দুই সারি ছাত্রছাত্রীর মাঝ দিয়ে গার্ড অব অনার নেওয়ার ভঙ্গিতে তারা মাথা উঁচু করে বেরিয়ে যেতে পারে? মেয়েটিকে মাথা নিচু করে যেতে হয় হাসপাতালে। বাংলাদেশে আজ সাধারণ মানুষের মাথা হেঁট আর অপরাধীরা ঊর্ধ্বমুণ্ড।

দিনাজপুরে ক্লাস চলাকালে সবাইকে বের করে দিয়ে এক ছাত্রীকে ক্লাসরুমে আটকে রাখল দুই যুবক। তাদের পরিচয় তারা ছাত্রলীগ করে। ঘটনা গত ২ মে তারিখের (ঢাকা ট্রিবিউন, ৩ মে)। দিনাজপুর টেক্সটাইল ইনস্টিটিউটের সব শিক্ষার্থী সেই বন্ধ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকল। অসহায় দাঁড়িয়ে থাকলেন শিক্ষকেরাও। কেউ থানায় খবর দেওয়ার কথা ভাবলেন না। হয়তো লাভ নেই বলেই। লাভ যে হতো না, তা বোঝা যায় পরে এই দুজনের একজনকে ধরে আবার মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়ার মধ্য দিয়ে।
অপরাধীরা ছাড়া পেয়ে ঘুরছে। মেয়েটিও হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েছে। কিন্তু দুই ছাড়া পাওয়া এক নয়। ছেলে দুটি বিনা শাস্তিতে আরও আরও অপরাধের ছাড়পত্র পেল। কিন্তু প্রতিকারহীন কষ্টে মেয়েটি আটকা পড়ল হতাশা আর ক্ষোভের গর্তে। অপরাধীদের শাস্তি না হওয়ায় সে হয়ে পড়ল আগের থেকে ভীত। তার পক্ষে স্বাভাবিক হওয়া কত কঠিন তা ‘মুচলেকাসর্বস্ব’ পুলিশ কি জানে?
শ্রেণিকক্ষে দুই মাস্তান ঢোকার মুহূর্ত থেকে তাদের বেরিয়ে যাওয়ার মুহূর্ত পর্যন্ত কত অল্প সময়। এটুকু সময়ের মধ্যে কত তফাত। কত বদলে গেল মেয়েটির জীবন, তা কি আইনের কর্তা রাষ্ট্রের হর্তারা জানেন?
আরেকটি ঘটনায় ঢাকার কমার্স কলেজের দুই ছাত্রছাত্রীকে বহিষ্কার এবং তাদের নয় বন্ধুর ভর্তি বাতিল করেছে কলেজ কর্তৃপক্ষ। ছাত্রের অপরাধ সে ছাত্রীর কাছে বিনীত ভঙ্গিতে প্রেম নিবেদন করেছে। ছাত্রীর অপরাধ সে আনন্দচিত্তে সেই নিবেদন গ্রহণ করেছে। আমরা অনুমান করতে পারি, ছাত্রটি প্রেম নিবেদনের পথে না গিয়ে দিনাজপুরের সেই দুই নিপীড়ক ছাত্রলীগারের মতো যদি নির্যাতনের পথে গেলে আরামে থাকত। প্রেম এখানে শাস্তিযোগ্য, অপরাধ নয়! এই বার্তাই দিচ্ছে আমাদের প্রশাসন।
অপরাধের শাস্তি না হওয়াই তো আসলে পুরস্কার। এই দেশে এখন সব অপরাধীকে সমান চোখে দেখা হয় না। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে এক আদিবাসী ছাত্রীকে লাঞ্ছনা, ছিনতাই ও প্রহারের দায়ে আজীবন বহিষ্কৃত বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের পাঁচ নেতা-কর্মীর বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। সম্প্রতি খুনের দায়ে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া এক যুবলীগ নেতার জীবনভিক্ষা দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি। মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন।
এ দেশে শিক্ষকের এমন এক মর্যাদা ছিল, যা সহসা কেউ লঙ্ঘন করত না। সমাজের নীতি ও মর্যাদার প্রতীক ছিলেন তাঁরা। সত্য যে বহু শিক্ষক নিজের মর্যাদা নিজেই রাখতে পারেননি। তাই বলে শিক্ষার্থীদের সামনে শিক্ষককে কান ধরে ওঠবস করানোর কথা চিন্তাই করা যেত না। অথচ নারায়ণগঞ্জে শিক্ষক শ্যামল কান্তির সঙ্গে সেটাই করা হয়েছে। ধর্ম অবমাননার যে অভিযোগ তাঁর প্রতি করা হয়েছে, তার কোনোই প্রমাণ মেলেনি। ক্ষমতাশালীরা ওই শিক্ষককে সরানোর প্রয়োজন বোধ করেছেন, তাই অপবাদ দিয়েছেন। তিনি যদি সত্যিই কোনো অন্যায় করেও থাকতেন, তার জন্য আদালত রয়েছে। একজন আইনপ্রণেতা নিজের হাতে আইন তুলে নিতে পারেন না। আইনপ্রণেতা সাংসদ কি আদালতকে উঠিয়ে দিতে চান? অথচ আমরা দেখছি যাদের জীবনে ধর্মের মহান নীতি ও আদর্শের কোনো ছাপই নেই, সেসব মাফিয়া, দুর্নীতিবাজ লোকেরাই ধর্মের দোহাই বেশি দিচ্ছে। এক লোক নিজের নামের আগে নিজেই শ্রী লাগায়। তো তাকে জিজ্ঞাসা করা হলে তার উত্তর: আমার জীবনে কোথাও শ্রী নাই, তাই নামের আগে শ্রী লাগিয়ে রেখেছি। দুর্বৃত্ততন্ত্র এভাবেই ধর্মকে অন্যায়ের সঙ্গে জড়িয়ে ধর্মের অবমাননা করছে।
প্রচারিত ভিডিওতে দেখা যায়, ওঠবস করতে করতে শিক্ষক শ্যামল কান্তি একপর্যায়ে পেছনে হেলে পড়ে গিয়েছেন। কত লজ্জা আর অপমানে এই শারীরিক প্রতিক্রিয়া হয়? এই পতন কি তাঁর, নাকি আমাদের সামগ্রিক মর্যাদাবোধের? বাংলাদেশে মর্যাদাবোধও সবার সমান হতে পারে না। কারও কারও আবার সেটা বাড়াবাড়ি রকমের উৎকট। তাঁরা হেলিকপ্টারে চড়ে গ্রামে বেড়াতে যান, গাড়ির বহর নিয়ে পরিদর্শনে নামেন, অভ্যর্থনার জন্য শত শত তোরণ আর অজস্র শিক্ষার্থীর দাঁড়িয়ে থাকা দেখে গর্ব হয় তাঁদের। কিন্তু মর্যাদার অধিকার তো শুধু গুটিকয়েক লোকের হতে পারে না। সেটা সর্বজনীন। মানুষমাত্রই মর্যাদাবান। নাগরিক মর্যাদাবোধ আইন, সমাজ ও সভ্যতার মৌলিক শর্ত। সামন্ত যুগে রাজা-জমিদারেরা প্রজাদের মর্যাদা আছে বলে বিশ্বাস করতেন না। আমরা কি তবে সেই যুগের দিকেই ফেরত যাচ্ছি?
একজন শিক্ষক কেন, যেকোনো ব্যক্তি যদি অপরাধ করেন, তবে আইনে তাঁর বিচার হবে। আদালত কাউকে জুতাপেটা বা কানে ধরানোর শাস্তি দেন না।
মর্যাদাহানি কোনো শাস্তি হতে পারে না। কোনো সভ্য দেশে এমন কোনো শাস্তির কথা জানা যায় না। একজনের ফাঁসি হতে পারে, কিন্তু তাঁকে নগ্ন করা, তাঁকে পেটানো, তাঁকে কান ধরে ওঠবস করানো যেতে পারে না। অথচ আমরা দেখেছি, কলেজশিক্ষককে নাঙ্গা করে ঘোরাচ্ছে ময়মনসিংহের গৌরীপুরে, কারণ তিনি নাকি এক মন্ত্রীর নিন্দা করেছিলেন (প্রথম আলো, ২৭ জুন, ২০১৪)। গত এপ্রিল মাসে বৃদ্ধকে বিবস্ত্র করে পেটানো হয়েছে ফেনীতে
এসব রাজনৈতিক ও সামাজিক বর্বরতার লক্ষণ। আমরা কি সভ্যতার দিকে এগোতে এগোতে বাঁক নিয়ে বর্বরতার দিকে যাত্রা করছি? এত এত যে ঘটনা ঘটছে সমাজের মধ্যে জাগরণ নেই, প্রতিবাদ নেই। নাকি সমাজও বিবস্ত্র ও হাত-পা বাঁধা অবস্থায় অসহায় দর্শকের ভূমিকায়? একদিকে সংঘবদ্ধ দুর্বৃত্ত শক্তির দাপট অন্যদের সমাজের অবশ দশাই আমাদের সময়ের চালচিত্র।
দিনাজপুরের ছাত্রী কিংবা কুমিল্লার তনু বা শিক্ষক শ্যামল কান্তির মতো সাধারণ মানুষের জীবন এই যে বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো আঘাতে তছনছ হচ্ছে—এসব কিসের লক্ষণ? আমাদের এখন আর পেট্রল বোমার ভয় নেই, কিন্তু হঠাৎ ক্ষমতার তাপে দগ্ধ হওয়ার ভয় বেড়েছে। চারদিকে তাকালে গভীর অন্যায়ের ছায়া দেখা যায়। এই অশুভ ছায়ার মধ্যে অপমান আর নির্যাতনের দিনলিপি লিখে যাওয়াই কি এখন কাজ?

Print Friendly

উপদেষ্টা সম্পাদক : আরিফ নেওয়াজ ফরাজী বাদল

সম্পাদক : হাবিবুল্লাহ মিজান

মোবাইল : ০১৫৩৪৬০৪৪৭৬, ই-মেইল : mizandeshi@gmail.com